দারাজের ‘মিষ্টি বক্স’ ঘিরে প্রতারণার অভিযোগ
দারাজের ‘মিষ্টি বক্স’ ঘিরে প্রতারণার অভিযোগ

আওরঙ্গজেব কামাল এর বিশেষ প্রতিবেদনঃ
৪৮৪ টাকার প্যাকেটে মিলল মাত্র ৪০ টাকার পণ্য, ২০২০ সালেই জমা পড়েছিল ৮১৭ অভিযোগ
বিশেষ প্রতিনিধি : দেশের অন্যতম অনলাইন মার্কেটপ্লেস দারাজের বিরুদ্ধে আবারও গ্রাহক প্রতারণার অভিযোগ সামনে এসেছে। এবার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘মিষ্টি বক্স’ নামে একটি আকর্ষণীয় অফার। ৪৮৪ টাকা দিয়ে ওই বক্স অর্ডার করে গ্রাহকের দাবি, প্যাকেট খুলে পাওয়া গেছে মাত্র কয়েকটি কমমূল্যের পণ্য—ছয়টি কাশির ট্যাবলেট, একটি চাটনি এবং দুই টাকা মূল্যের কয়েকটি চকলেট। অভিযোগকারী গ্রাহকের হিসাব অনুযায়ী, সব পণ্যের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪০ টাকা। ফলে ৪৮৪ টাকা পরিশোধের বিপরীতে পণ্যের কথিত মূল্য নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে দারাজে একটি ‘মিষ্টি বক্স’ অর্ডার করা হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকার আশুলিয়া থানার টাঙ্গাইল স্কুলের সামনে দারাজের ডেলিভারি প্রতিনিধির কাছ থেকে প্যাকেটটি গ্রহণ করা হয়। এ সময় বিকাশের মাধ্যমে ৪৮৪ টাকা পরিশোধ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ডেলিভারি প্রতিনিধির উপস্থিতিতে প্যাকেটটি খোলার চেষ্টা করলে তিনি এতে বাধা দেন। পরে প্যাকেট খুলে কথিতভাবে পাওয়া যায় ছয়টি কাশির ট্যাবলেট, একটি চাটনি ও কয়েকটি চকলেট। অভিযোগকারীর দাবি, এগুলোর মোট বাজারমূল্য ৪৮৪ টাকার তুলনায় অত্যন্ত কম।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—‘মিষ্টি বক্স’ অফারটির বিজ্ঞাপনে ঠিক কী কী পণ্য, কী পরিমাণ এবং কী মূল্যের কথা বলা হয়েছিল? অর্ডার কনফার্মেশনে কী উল্লেখ ছিল? প্যাকেটের ইনভয়েসে কী মূল্য দেখানো হয়েছে? এবং সর্বোপরি, ওই পণ্যগুলো আসলে অর্ডার করা পণ্যের সঙ্গে মিলে কি না—এসব বিষয় যাচাই না করে ঘটনাটিকে চূড়ান্তভাবে প্রতারণা বলা যাচ্ছে না। তাই অভিযোগটির নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
দারাজের নিজস্ব বর্তমান রিটার্ন নীতিতে বলা হয়েছে, ডেলিভারির সময় পাওয়া পণ্য যদি ভুল, অসম্পূর্ণ, নকল বা পণ্যের বর্ণনা/ছবির সঙ্গে না মেলে, নির্দিষ্ট শর্তে রিটার্নের আবেদন করা যায়। দারাজের রিফান্ড নীতিতেও ফেরত দেওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অর্থ ফেরতের কথা বলা হয়েছে; বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করা অর্থ ফেরতের ব্যবস্থাও তাদের নীতিতে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এ ঘটনায় দারাজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি। তবে এই প্রতিবেদনের প্রকাশ পর্যন্ত ‘মিষ্টি বক্স’-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে দারাজ কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগের অপর পক্ষের অবস্থানও স্পষ্ট হবে।
দারাজের বিরুদ্ধে গ্রাহক অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২০ সালের নভেম্বরে RTV-এর এক প্রতিবেদনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে দারাজের বিরুদ্ধে ৮১৭টি অভিযোগ জমা পড়ার কথা প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব অভিযোগের বিষয়ে গণশুনানিতে দারাজের কোনো প্রতিনিধি হাজির হননি এবং অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তবে ২০২০ সালের ওই ৮১৭ অভিযোগকে ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতির পরিমাপক হিসেবে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না। কারণ সেটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পুরোনো তথ্য। বর্তমান সময়ে একই ধরনের অভিযোগের সংখ্যা, নিষ্পত্তির হার কিংবা দারাজের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কোনো সরকারি তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়েছে কি না—এসব আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে দারাজের বর্তমান শর্তাবলিতে বলা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস হিসেবে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে লেনদেনের সুযোগ দেয় এবং পণ্যের বাণিজ্যিক শর্তাবলি সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার দারাজের Marketplace Agreement-এ বিক্রেতার সঠিক পণ্য গ্রাহকের কাছে পাঠানোর দায়িত্বের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এ অবস্থায় ‘মিষ্টি বক্স’ নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্তে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিজ্ঞাপনে কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল? অর্ডার করা পণ্য কী ছিল? প্যাকেট প্রস্তুত ও সরবরাহ করেছে কোন বিক্রেতা? ইনভয়েসে কী মূল্য দেখানো হয়েছে? ৪৮৪ টাকা মূল্যের মধ্যে পণ্যের মূল্য, ডেলিভারি চার্জ বা অন্য কোনো চার্জ কত ছিল? এবং অভিযোগ করা পণ্যগুলো কীভাবে ওই অর্ডারের সঙ্গে যুক্ত হলো?
ভুক্তভোগীদের দাবি, অনলাইন কেনাকাটায় বিজ্ঞাপনে প্রদর্শিত পণ্য ও বাস্তবে পাওয়া পণ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিক্রেতার বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ করে তার নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
এদিকে দারাজের নিজস্ব সহায়তা ব্যবস্থায় পণ্য ফেরত দেওয়ার জন্য অনলাইন রিটার্ন ফরম ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে এবং পণ্য ভুল, অসম্পূর্ণ বা বর্ণনার সঙ্গে না মিললে নির্দিষ্ট শর্তে রিটার্নের বিধান রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই—৪৮৪ টাকার ‘মিষ্টি বক্সে’ যদি সত্যিই প্রায় ৪০ টাকার পণ্যই দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এই মূল্যবৈষম্যের কারণ কী? এটি কি কোনো বিক্রেতার বিচ্ছিন্ন অনিয়ম, নাকি অফারটির উপস্থাপন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে—তা নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে।
গ্রাহকরা তাই দারাজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগটির স্বচ্ছ ব্যাখ্যা, প্রয়োজন হলে অর্থ ফেরত এবং সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগটি যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।
এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

























মন্তব্য: