আলোকিত নক্ষত্রের পতনে শোকে স্তব্ধ ঈশ্বরগঞ্জবাসী
আলোকিত নক্ষত্রের পতনে শোকে স্তব্ধ ঈশ্বরগঞ্জবাসী

মিয়া সুলেমান, ঈশ্বরগঞ্জ প্রতিনিধি:
“কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু চলে যান না; তারা স্মৃতির আকাশে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করেন।”
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ী ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর সরকার বাড়ির কৃতী সন্তান, সাবেক ছাত্রনেতা, পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজসেবক ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় মানুষ ফখরুল আমিন সরকার ঢাকায় তাঁর নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (১৮/০৭/২০২৬)। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং আঠারবাড়ীসহ সমগ্র ঈশ্বরগঞ্জে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মৃত্যু জীবনের অনিবার্য সত্য হলেও কিছু মানুষের প্রস্থান শুধু একজন মানুষের বিদায় নয়; একটি আন্তরিক হৃদয়, একটি ভালোবাসার আশ্রয়, একজন অভিভাবকসুলভ মানুষ এবং সমাজের একজন নীরব আলোকবর্তিকার বিদায়। ফখরুল আমিন সরকারের প্রয়াণে সেই শূন্যতাই আজ গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি নেতৃত্বগুণ, শৃঙ্খলাবোধ এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত ছিলেন। সৌজন্যপূর্ণ আচরণ, মানবিক মূল্যবোধ, বিনয়, সততা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে একজন গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। এলাকার বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষামূলক ও মানবিক উদ্যোগে তাঁর নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি পরিচ্ছন্ন, শালীন ও মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতির চর্চায় বিশ্বাসী ছিলেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত মানসিকতা তাঁকে সবার কাছে সম্মানিত করে তোলে। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, অন্যের অবদানকে মূল্যায়ন করা এবং সহজেই সবাইকে আপন করে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।
ফখরুল আমিন সরকারের মৃত্যু ঘিরে অফলাইন ও অনলাইন—উভয় পরিসরেই যে পরিমাণ শোক, স্মৃতিচারণ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে, তা তাঁর ব্যক্তি-জীবনের গ্রহণযোগ্যতা ও মানবিকতারই প্রতিফলন। অসংখ্য মানুষের স্মৃতিচারণে একটি বিষয়ই বারবার উঠে এসেছে—রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তিনি ছিলেন আপনজনেরও আপন।
জানাজায় উপস্থিত অনেকেই জানান, কোনো বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করলে তিনি কখনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না। বরং হাসিমুখে মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, ইতিবাচকভাবে মতামত গ্রহণ করতেন এবং আন্তরিকভাবে সহযোগিতার চেষ্টা করতেন। এই ইতিবাচক মনোভাবই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য।
ফখরুল আমিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া শোকবার্তায় তিনি বলেন,
“কিছু কিছু মানুষের বিদায় আত্মাকে ভেঙে দিয়ে যায়। অনেক কৃতজ্ঞতা জানানোর ছিল, অনেক কিছুই করার ছিল। ভালো থাকবেন পরপারে। এক জীবনের এই ছোট্ট সময়ে গভীর এক মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ থাকার সময়ে আপনাকে হারিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ঈশ্বরগঞ্জের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করছি। আমার নির্বাচন এবং কঠিন সময়ে আপনার পাশে থাকা আমাকে আজীবন ঋণী করে রাখবে।”
তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও শিক্ষানুরাগী মিয়া সুলেমান শোক প্রকাশ করে বলেন, “আর কেউ হয়তো আমাকে সেই স্নেহভরা কণ্ঠে বলবে না—‘সুলেমান বাবা, তুমি কেমন আছো?’ এই একটি ডাক আজীবন আমার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হবে। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও ভালোবাসা, স্নেহ ও আন্তরিকতায় তিনি ছিলেন আমার আপনজনেরও আপন। তাঁর অকস্মাৎ প্রয়াণে শুধু একটি পরিবার নয়, তাঁকে ভালোবাসা অসংখ্য মানুষ একজন অভিভাবকসুলভ মানুষকে হারাল।”
তিনি আরও বলেন, মানুষের প্রকৃত পরিচয় পদ-পদবিতে নয়; বরং মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসা, মানবিকতা ও সৎকর্মে। ফখরুল আমিন সরকারের জীবন আমাদের সেই চিরন্তন শিক্ষাই দিয়ে যায় যে মানুষের হৃদয় জয় করার চেয়ে বড় কোনো অর্জন নেই।
এদিকে, মরহুমের কর্মস্থলের কর্ণধার এম জে আলম এক আবেগঘন ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানান, কুয়ালালামপুরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ফখরুল আমিন সরকার তাঁর বাসার নিচে এসে সালাম দিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। তখন তিনি কল্পনাও করতে পারেননি, সেটিই হবে তাঁদের শেষ দেখা। কুয়ালালামপুরে পৌঁছে ভোরে ঘুম থেকে জেগেই তিনি সহকর্মীর মৃত্যুসংবাদ পান এবং এ খবর শুনে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত এক বছর ধরে ফখরুল আমিন সরকার তাঁদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। সততা, দায়িত্বশীলতা, অমায়িক ব্যবহার ও পরোপকারী মনোভাবের কারণে অল্প সময়েই তিনি সবার প্রিয় হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে ছোট ভাই ও বন্ধুর মতো ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন ধর্মপ্রাণ এবং নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন।
এম জে আলম বলেন, “আজ আমি হারালাম একজন বিশ্বস্ত সহকর্মী, একজন প্রিয় বন্ধু ও একজন স্নেহের ছোট ভাই। এই ক্ষতি কখনো পূরণ হওয়ার নয়। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে তাঁর ছোট ছোট সন্তানদের কথা ভেবে। তারা আজ পিতৃহারা হলো। এই মৃত্যু সত্যিই অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।”
এদিকে, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য পেশাজীবী মহলের অসংখ্য ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন।
মরহুমের পরিবারের পক্ষ থেকে সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে—জীবদ্দশায় চলাফেরা, কথাবার্তা কিংবা অজান্তে কোনো আচরণে যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, তবে মহানুভবতার সঙ্গে তাঁকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষমা করে দেবেন। একই সঙ্গে পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী, প্রতিবেশী এবং এই শোকের সময় পাশে দাঁড়ানো সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, মৃত্যুকালে ফখরুল আমিন সরকার স্ত্রী, এক পুত্রসন্তান, এক কিশোরী কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
মহান আল্লাহ তাআলার কাছে সবার একান্ত প্রার্থনা—তিনি যেন মরহুম ফখরুল আমিন সরকারকে ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত ও নূরে পরিপূর্ণ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় শোক ধৈর্য ও ঈমানের সঙ্গে বহন করার তাওফিক দান করেন। আমীন।
বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।
এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

























মন্তব্য: