চা-শ্রমিকদের সম্পর্কে চা-বোর্ড চেয়ারম্যানের বক্তব্যের প্রতিবাদে চা শ্রমিক ইউনিয়নের সংবাদ সম্মেলন
চা-শ্রমিকদের সম্পর্কে চা-বোর্ড চেয়ারম্যানের বক্তব্যের প্রতিবাদে চা শ্রমিক ইউনিয়নের সংবাদ সম্মেলন

দেওয়ান মাসুকুর রহমান, নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজারঃ
এটিএন বাংলার একটি টকশোতে চা-শ্রমিকদের সম্পর্কে বাংলাদেশ চা-বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মেজবাহ উদ্দীন আহমেদ কর্তৃক নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে দেয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন।
রবিবার (১০ মে ২০২৬) দুপুরে শ্রীমঙ্গল শহরস্থ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সদর দপ্তর লেবার হাউসের মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
এতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী, সংগঠনের বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা, কার্যকরী সভাপতি বৈশিষ্ট্য তাঁতী, জুড়ি ভ্যালির সভাপতি কমল বোনার্জী, সাংগঠনিক সম্পাদক কন্ঠ তাঁতী, চা শ্রমিক ইউনিয়নের স্টাফ দুলাল হাজরা সহ বিভিন্ন চা বাগানের পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে “প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া সহ উপস্থিত সকল গণমাধ্যমের বন্ধুদের প্রতি বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কর্তৃক অদ্যকার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইউনিয়ন দুঃখের সাথে আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছে যে, বাংলাদেশের একজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ চা বোর্ডের সম্মানিত চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ একটি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলা চট্টলা’র “মুখোমুখি” নামক সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে চা শ্রমিকদের দৈনিক কর্মঘন্টা এবং চা শ্রমিক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়াদি তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বাগান ম্যানেজমেন্টের বিষয়ে চা শ্রমিকদেরকে দোষারোপ করেন। চা শ্রমিকগণ দৈনিক ৮ঘন্টার স্থলে ৩/৪ঘন্টা কাজ করেন। তিনি বলেছেন মালিক পক্ষের অর্ধাংশ শিল্পই এখানে লোকসান হচ্ছে। অথচ চা শ্রমিকগণ যথাযথ নিয়মতান্ত্রিক নিরলসভাবেই কাজ করে আসছে। আমরা ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এটিএন বাংলা চট্টলা’কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি যে, চা শিল্পের একমাত্র নিয়ামক হিসেবে চা শ্রমিকদের সন্তোষজনক অবদান, কল্যাণ এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের কথা তুলে ধরে, চা শ্রমিকদেরকে সম্মান জানিয়েছেন। চেয়ারম্যান মহোদয় গত ২০২৫ সালে চা শ্রমিক অসন্তোষ নেই, শ্রমিকদের অসন্তুষ্টি কমে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন চা বাগানে আজঅব্দি নানাবিধ সমস্যা, মজুরী, পিএফ অর্থ পরিশোধ, বাসস্থান, চিকিৎসা বিষয়ে অসন্তোষ চলমান আছে। ইউনিয়ন এসব বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। অথচ চেয়ারম্যান মহোদয়ের জানা আছে, বিশেষ করে এনটিসি মালিকানাধীনসহ বিভিন্ন চা বাগান গুলোতে শ্রমিকদের প্রতি মালিক পক্ষের শোষণ বঞ্চনা রয়েছে। কিন্তু তিনি একতরফাভাবে মালিক পক্ষের দিকে সমর্থন করে চা এর মার্কেটে ফ্লোর রেইট বৃদ্ধি করা, প্রভৃতির কথা তুলে ধরেছেন। চা এর মূল কারিগরদের দোষারোপ করে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চা উৎপাদন ৮ম অবস্থানে রয়েছে মর্মে গর্ব করেছেন। শ্রমিকরা যদি ৩/৪ঘন্টা কাজ করত: তবে ৮ম অবস্থান দখলে মালিকপক্ষ কিংবা সরকার কি নিয়ে আসতে পারত? বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মহোদয় চা শ্রমিকদের দোষারোপ করে হেয় প্রতিপন্ন করে আগামী ১০ বছরে, তিনি কমপক্ষে ২০- ২৫ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করাবেন। উনার এইরকম মনোভাবাপন্ন ভিশনে অদ্য আমাদের বোধগম্য নয়। চা শ্রমিকগণই বিগত প্রায় ২০০শত বর্ষ ধরে প্রতিষ্ঠিত টি ইন্ডাস্ট্রি এদেশে গড়ে তুলেছেন। আগামীর জন্যও চা শ্রমিকগণ প্রস্তুত রয়েছেন। এখন দেখা যাচ্ছে নিরীহ সরলমনা এই চা জনগোষ্টির প্রতি চেয়ারম্যান মহোদয়ের নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনায়, চা শ্রমিকদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা, চা শ্রমিকদের মনে মানসিক অশান্তি সৃষ্টি করছে। আমরা বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রমিকদের পক্ষে এর তীব্র নিন্দা প্রকাশ করছি এবং চেয়ারম্যান মহোদয়ের উক্তিগুলো প্রত্যাহরের দাবী জানাচ্ছি। পরিশেষে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিকস মিডিয়া এবং সংবাদ মাধ্যম বন্ধুগণকে, সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের বন্ধুদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; একাত্তর টিভির মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি আহমেদ ফারুক মিল্লাদ, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি ও দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার প্রতিনিধি দীপঙ্কর ভট্টাচার্য লিটন, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার প্রতিনিধি শিমুল তরফদার, আরটিভির মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি চৌধুরী ভাস্কর হোম, ডেইলি অবজারভার পত্রিকার প্রতিনিধি রূপম আচার্য, দৈনিক সকালের খবর পত্রিকার প্রতিনিধি রাজেশ ভৌমিক সহ অন্যান্য গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।
চা বোর্ড চেয়ারম্যানের নেতিবাচক বক্তব্য চা শ্রমিকদের জন্য অবমাননাকর: সৈয়দ আমিরুজ্জামান
এটিএন বাংলার একটি টকশোতে চা-শ্রমিকদের সম্পর্কে বাংলাদেশ চা-বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মেজবাহ উদ্দীন আহমেদ কর্তৃক নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে দেয়া বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মুঠোফোনে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেছেন, এটিএন বাংলার একটি টকশোতে চা-শ্রমিকদের সম্পর্কে বাংলাদেশ চা-বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মেজবাহ উদ্দীন আহমেদের উপস্থাপিত তথ্যকে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও অবমাননাকর আখ্যা দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, জাতীয় টেলিভিশনে চা-বোর্ড চেয়ারম্যান দাবি করেছেন যে চা-শ্রমিকরা মাত্র ৩-৪ ঘণ্টা কাজ করেন এবং তাদের জীবনাচার অনেক উন্নত। এই তথ্য কেবল ভিত্তিহীনই নয়, বরং শোষিত ও অবহেলিত চা-শ্রমিকদের জীবন সংগ্রামের প্রতি এক নিষ্ঠুর উপহাস মাত্র। বাস্তবে চা-শ্রমিকরা বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ মাত্র ১৮৭ টাকা দৈনিক মজুরিতে ভয়াবহ অমানবিক পরিবেশে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ধারিত ‘নিরিখ’ পূরণ করতে তাদের দৈনিক ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করতে হয়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বাগানগুলোতে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা তো দূরের কথা, ন্যূনতম পানীয় জল, বিশ্রামের ছাউনি কিংবা রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থাই বাগান কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে না। এমন প্রতিকূল অবস্থায় চা-শ্রমিকদের লড়াই আজ কেবল মজুরি বৃদ্ধি বা ভূমির অধিকারে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ন্যূনতম মানবিক নাগরিক অধিকারের জন্য তাদের প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, চা-শ্রমিকদের কাজের প্রতি অনীহা বা তাদের ব্যক্তিগত জীবনাচার নিয়ে চেয়ারম্যান যে ধরণের নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন, তা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাসকে অবমাননাকর ও হেয় প্রতিপন্ন করার সামিল। দেশের চা শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চা বোর্ডের সর্বোচ্চ পদে থেকে এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য প্রদান কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং আমি মনে করি দেশের চা শিল্পের বৃহত্তর স্বার্থে অবিলম্বে তা প্রত্যাহার করবেন।
বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।
এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
























মন্তব্য: