ফুলবাড়ীতে জমি নিয়ে বিরোধ, নিশাদের বক্তব্যের প্রতিবাদে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন
ফুলবাড়ীতে জমি নিয়ে বিরোধ, নিশাদের বক্তব্যের প্রতিবাদে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন

মাফিকুল ইসলাম, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)-
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ইমরান চৌধুরী নিশাদের করা বিভিন্ন অভিযোগের প্রতিবাদে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেছে অপর পক্ষ।
শনিবার ফুলবাড়ীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তারা দাবি করে, নিশাদের সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে জমির মালিকানা, দখল ও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিয়ে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা ভূমি রেকর্ড, দলিল এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনগত নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিরোধপূর্ণ জমিটি ফুলবাড়ী উপজেলার রাঙ্গামাটি মৌজায় অবস্থিত। সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, এসএ খতিয়ান-১৭৪-এর ১১৪৫ নম্বর দাগে মোট ৩২ শতক জমি ছিল। এর মধ্যে ১৯৫৩ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ছয় শতক জমি অধিগ্রহণ করে। ফলে অবশিষ্ট থাকে ২৬ শতক।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সামছুল হুদা চৌধুরীর ওয়ারিশদের কাছ থেকে ১৯৮৮ সালের ১২ এপ্রিল ২৪৫৭ নম্বর কবলা দলিলের মাধ্যমে মো. শহিদুল ইসলাম ১৬ শতক জমি কেনেন। পরবর্তীতে একই দাতাদের কাছ থেকে ১৯৯১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনটি পৃথক দলিলের মাধ্যমে অপর পক্ষের কয়েকজন মোট ১৬ শতক জমি কেনেন বলে দাবি করা হয়।
পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জমির মোট দলিলকৃত পরিমাণ ৩২ শতক হলেও ছয় শতক অধিগ্রহণের কারণে বাস্তবে অবশিষ্ট জমি ছিল ২৬ শতক। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভূমি জরিপ ও রেকর্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে শহিদুল ইসলামের নামে ১৬ শতক এবং অপর পক্ষের নামে অবশিষ্ট জমি রেকর্ড করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
ভূমি রেকর্ড নিয়ে একাধিক মামলা
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, জমির খারিজ ও রেকর্ড নিয়ে একাধিক প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া হয়েছে। ২০১০-২০১১ সালে অপর পক্ষের লোকজন ১৬ শতক জমি খারিজের আবেদন করলে সরেজমিন তদন্ত ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর সেই আবেদন নামঞ্জুর করা হয় বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
শহিদুল ইসলামের নামে করা খারিজ বাতিলের জন্যও আবেদন করা হয়েছিল। সেটিও নামঞ্জুর হওয়ার পর রিভিউ আবেদন করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ১৪ জুলাই খারিজ বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), দিনাজপুরের কাছে আপিল করা হয়।
লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, ওই আপিলের পর ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ বাটোয়ারা দলিল না হওয়া পর্যন্ত আগের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার আদেশ দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, চলমান জরিপে শহিদুল ইসলামের নামে ১৬ শতক জমি মাঠ পর্চায় রেকর্ড হয়েছে। সেখানে ডিপি খতিয়ান-৫০৯ এবং হাল দাগ-৮০৯-এর উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া অপর পক্ষের একজন ২০০৯ সালে ৩০ ধারায় আপত্তি দাখিল করে ২৬ শতকের মধ্যে ১৩ শতক নিজের নামে রেকর্ডের দাবি করেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট দলিল, খারিজ, নামজারি ও সরেজমিন তদন্তের পর ওই আপত্তি নামঞ্জুর করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ৩১ ধারায় করা আপিলও নিষ্পত্তির মাধ্যমে আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
১৬৪৫ নম্বর দাগ নিয়ে প্রশ্ন
ইমরান চৌধুরী নিশাদ তাঁর সংবাদ সম্মেলনে ১৬৪৫ নম্বর দাগের জমি কেনার বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বলে উল্লেখ করে এর প্রতিবাদ জানায় অপর পক্ষ।
তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট আপিলের নথিতে ২০৮/৮৩ নম্বর অগ্রক্রয় মামলার দাগ নম্বর নিয়ে অসঙ্গতির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলার নথিতে ১৬৪৫ নম্বর দাগের উল্লেখ থাকলে সেটি টাইপিংজনিত ভুল হতে পারে।
তবে দাগ নম্বর নিয়ে প্রকৃত তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট মৌজা, মূল খতিয়ান, দলিল ও মামলার নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে তারা জানিয়েছে।
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতিবাদ
ইমরান চৌধুরী নিশাদ সাংবাদিক হারুন উর রশীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে সংবাদ প্রকাশ এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন বলেও পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
অপর পক্ষের দাবি, ৮ আগস্ট থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করা হয় এবং সংবাদ প্রকাশের আগে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল।
নিশাদ সাংবাদিককে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। এর প্রমাণ প্রকাশের দাবি জানায় অপর পক্ষ।
তবে ওই অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন প্রমাণ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ
পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে ইমরান চৌধুরী নিশাদ ও তাঁর পক্ষের লোকজন নতুন করে তৎপর হন। তাদের দখলে থাকা জায়গায় টিনের ছাউনি নির্মাণ এবং বাধা দিলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়।
অপর পক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা ওই জমি ও স্থাপনা ভোগদখল করে আসছে।
তবে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে ইমরান চৌধুরী নিশাদের পক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। দুই পক্ষের দাবির মধ্যে বিরোধ থাকায় সংশ্লিষ্ট দলিল, ভূমি রেকর্ড, আদালতের নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিরোধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে এনসিপির সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বক্তারা বলেন, জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সংঘাত বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।
এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

























মন্তব্য: