মোরেলগঞ্জে কলেজছাত্র জাহিদুলের রহস্যজনক মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যা? পরিবার, বন্ধু ও এলাকাবাসীর অভিযোগে ঘনীভূত রহস্য
মোরেলগঞ্জে কলেজছাত্র জাহিদুলের রহস্যজনক মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যা? পরিবার, বন্ধু ও এলাকাবাসীর অভিযোগে ঘনীভূত রহস্য

মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি:
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে সরকারি সিরাজ উদ্দিন মেমোরিয়াল কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম হাওলাদার (২০)-এর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন সামনে আসছে। পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়; বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) উপজেলার ১০ নম্বর হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের ছোটবাদুরা এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
‘আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যা’—এই স্লোগানে আয়োজিত বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচিতে নিহতের স্বজন, সহপাঠী ও শতাধিক এলাকাবাসী অংশ নেন। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

নিহতের পিতা মনিরুল ইসলাম জানান, জাহিদুল দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের একটি হোটেলে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির পাশাপাশি তিনি সরকারি সিরাজ উদ্দিন মেমোরিয়াল কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও ঘটনার প্রায় চার দিন আগে থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তার কোনো খোঁজ পাননি।
পরিবারের ভাষ্যমতে, গত ১ আগস্ট সকালে গ্রামের বাড়ির অদূরে একটি মেহগনি গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় জাহিদুলের মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনাস্থল থেকে জাহিদুলের পরনের একটি গেঞ্জি, যা পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় ছিল, উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তার প্যান্টের এক পকেট থেকে একটি হাতে লেখা চিরকুট এবং অন্য পকেট থেকে দুটি গ্যাস লাইটার ও একটি সিগারেটের প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এসব আলামত তদন্তের অংশ হিসেবে জব্দ করেছে পুলিশ। তবে চিরকুটের বিষয়বস্তু বা এসব আলামতের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি পুলিশ।
নিহতের মা আছিয়া বেগমের দাবি, মরদেহের মুখে বিষের চিহ্ন ছিল। তার অভিযোগ, ছেলেকে হত্যা করে পরে গাছে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে ঘটনাটি উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মুখে বিষের চিহ্ন বা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনো কোনো সরকারি ফরেনসিক বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাহিদুলের সহপাঠী মো. আসিফ শেখ দাবি করেন, প্রায় তিন বছর আগে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার কালাইয়া এলাকার এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে টিকটকে জাহিদুলের ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার অভিযোগ, ওই নারী নিয়মিত জাহিদুলের কাছ থেকে অর্থ নিতেন এবং বিভিন্ন সময়ে উপহার চাইতেন। ঘটনার কিছুদিন আগে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
তিনি আরও দাবি করেন, জাহিদুলের মৃত্যুর পরও ওই নারী তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন ছবি ও টিকটক ভিডিও প্রকাশ করে যাচ্ছেন। এছাড়া তার অভিযোগ, ঘটনার পর ওই নারী ও তার স্বামী নিজ এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।
চট্টগ্রামে জাহিদুলের কর্মস্থলের সূত্র উদ্ধৃত করে আসিফ শেখ আরও দাবি করেন, ঘটনার আগে দুই নারী ও এক পুরুষ চট্রগ্রামের হোটেল থেকে জাহিদুলকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন হোটেল কর্তৃপক্ষ।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তাদের পরিবারের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
মানববন্ধনে নিহতের বড় ভাই আসাদুল ইসলাম, সাইফুল হাওলাদার, চাচা জামাল হাওলাদার, মামা আফজাল শেখ, হাবিবুর রহমানসহ স্থানীয় ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, জাহিদুল শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী একজন শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাদের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি মৃত্যুর ঘটনাকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে। তাই এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে নয়, সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করা উচিত।
এ বিষয়ে মোরেলগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, জাহিদুলের মৃত্যুকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও গুঞ্জন রয়েছে। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি ঘিরে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। চার দিন ধরে জাহিদুলের মোবাইল ফোন কেন বন্ধ ছিল? তিনি চট্টগ্রাম থেকে কীভাবে এবং কার সঙ্গে গ্রামের বাড়ির এলাকায় এলেন? হোটেল থেকে তাকে ডেকে নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? মৃত্যুর আগে তার সর্বশেষ অবস্থান কোথায় ছিল? উদ্ধার হওয়া চিরকুটে কী লেখা ছিল এবং সেটি তদন্তে কী গুরুত্ব বহন করছে? তার মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য কী বলছে? সর্বোপরি, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদনে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী উঠে আসে?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই জাহিদুল ইসলাম হাওলাদারের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হতে পারে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
উল্লেখ্য, গত ১ আগস্ট মোরেলগঞ্জ উপজেলার ছোটবাদুরা এলাকায় একটি মেহগনি গাছ থেকে জাহিদুল ইসলামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর থেকেই এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তদন্ত ও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।
এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

























মন্তব্য: