কটিয়াদীতে সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটায় শুরু হয়েছে বৈশাখী মেলা, ইজারা মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা | বিডি-প্রেস 24 ডট কম
হোম / পরিবার / বিস্তারিত

কটিয়াদীতে সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটায় শুরু হয়েছে বৈশাখী মেলা, ইজারা মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা

15 May 2026, 11:20:19

কটিয়াদীতে সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটায় শুরু হয়েছে বৈশাখী মেলা, ইজারা মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা

(৭১ হাজারের ইজারা মূল্য এবছরে দাড়িয়েছে ৭ লাখে)

​এ.এস.এম হামিদ হাসান, কটিয়াদী(কিশোরগঞ্জ)প্রতিনিধি:

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসূয়া গ্রামে প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারো শুরু হচ্ছে বৈশাখী মেলা৷ এটি পুরো জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশও। মেলা উপলক্ষে গোটা এলাকায় এক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে।

উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের মসূয়া গ্রামে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অস্কার বিজয়ী বিশ্ব নন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক বাড়ির মাঠে এই মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এটি প্রায় দুইশো বছরের পুরনো একটি মেলা৷

বুধবার ( ১৩ মে) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐতিহ্যবাহী মেলাটি শুরু হয়েছে। তবে মেলাটি তিনদিন ব্যাপী হওয়ার কথা থাকলেও মেলা গড়িয়ে যায় প্রায় সাতদিন৷
এছাড়াও এ খেলাটি শুরুর ২/৩ দিন আগেই এখানে দোকদানপাট ও মানুষের আনাগোনায় মেলা প্রাঙ্গ প্রানবন্ত হয়ে ওঠে ৷
তবে অন্য বছরের তুলনায় এবারের মেলা নিয়ে জনমনে ও এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি  হয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটাকে কেন্দ্র করে বিশেষ করে আয়োজিত এ মেলার এবারের ইজারামূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

​স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো ব্যবসায়িক কারণ নয়, বরং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারই মূল ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে হয়।

গত বছরের ৭১ হাজার ৭০০ টাকার মেলার ডাক এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকায়। তবে এবারের ইজারা মূল্যকে আকাশচুম্বী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কারণে এতে মেলায় অংশ নেওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি ভাড়ার চাপ পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ।

ইজারামূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মেলায় আগত ছোটখাটো ব্যবসায়ীরা ভাড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত খাজনার চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ঘাড়েই পড়বে। তবে মেলা কমিটির দাবি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই খাজনা নির্ধারণ করা হবে এবং কাউকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হবে না।

​জানা গেছে, সোমবার (১৩ মে) বিকালে উপজেলার নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে প্রকাশ্যে ওপেন নিলামে ৭ জন অংশ নেন।
তবে এখানে দুই পক্ষের দরকশাকশিতে অবশেসে ৭১ হাজার ৭০০ টাকার ইজারামূল্য ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় ওঠে।

​এলাকাবাসী জানায়, প্রতিবছর বৈশাখের শেষ বুধবার থেকে তিন দিনব্যাপী চলে এ মেলা। বৈশাখী মেলার প্রচলন সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ জমিদার হরি কিশোর রায় চৌধুরীর সময়কাল থেকে শুরু হয়। শ্রী শ্রী কাল ভৈরব পূজা উপলক্ষে তিনি এ মেলার প্রচলন শুরু করেছিলেন। এ বাড়িটি এলাকায় রায় বাড়ি নামেই পরিচিত। তবে সারা দেশে সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটা নামেই পরিচিত।

​​পাকুন্দিয়া উপজেলার চরকাওনা নতুন বাজার থেকে আসা ব্যবসায়ী মো. আবদাল মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে আমি এই মেলায় ব্যবসা করতে আসছি। এতদিন পর্যন্ত আমরা এক হাজার টাকা খাজনা (বা ভাড়া) দিয়ে ব্যবসা করেছি। কিন্তু এ বছর মেলার ডাক অনেক বেশি হওয়ায় আমাদের ওপর ভাড়ার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা সাধারণ মানুষ, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ৬-৭ দিন কষ্ট করে মেলার খেলনার ছোটখাট পণ্যের ব্যবসা করি সামান্য কিছু লাভের আশায়। এখন আমাদের কাছ থেকে যদি ৭-৮ হাজার টাকা ভাড়া দাবি করা হয়, তবে সেটা দেওয়া আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই আমরা হাট কর্তৃপক্ষ আমাদের এই দুরবস্থা বিবেচনা করে ভাড়ার বিষয়টি যেন পুনর্বিবেচনা করা হয়।

​আরেক ব্যবসয়ী বলেন, আমরা প্রতি বছরই এই ঐতিহাসিকভাবে সুপরিচিত মেলায় আসি। দেশটি এই মেলার জন্য বেশ পরিচিত, ৩ দিনব্যাপী উৎসব হলেও মেলায় মেলার আমেজ থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। আগে মেলায় ভাড়া ছিল চার হাজার টাকা। সাধারণত মেলা সাত দিন চললেও আমরা মূলত পাঁচ দিন বেচাকেনা করি। এবার মেলার ইজারা বা ডাক যেহেতু গত বছরের তুলনায় বেশি,তাই স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের লোকসান হওয়ার কিছুটা হওয়ার কিছুটা আশঙ্কা রয়েছে । তবে বেচাকেনা ভালো হলে হয়তো এর প্রভাব খুব একটা গায়ে লাগবে না। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হলে কিংবা ঝড়-বৃষ্টির কারণে যদি বিক্রি কম হয়, তবে চড়া ভাড়ার কারণে আমাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। অনেকেই হয়তো লোকসান দিয়ে মেলা ছাড়বেন। সেই তুলনায় ভাড়া কিছুটা কম থাকলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য টিকে থাকা সহজ হতো।

​​এ বিষয়ে মসূয়া ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, আমরা মূলত মেলার সার্বিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি দেখাশোনা করি। যারা ইজারা নিয়েছেন তারাই সব কার্যক্রম পরিচালনা করেন। শুনেছি, প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য রয়েছে এই মেলার। বৈশাখ মাসের শেষ বুধবার থেকে মেলা শুরু হয় এবং সাধারণত তিন দিন চলে। মেলার ডাক উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে হয়। আয়-ব্যয়ের বিষয়ও উপজেলা পরিষদের অধীনে। ইজারা মূল্য বাড়লে তার প্রভাব তো পড়বেই। কারণ যারা ইজারা নিয়েছেন, তারা সেই টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করবেন।

​মেলা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, এটি এই ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী একটি মেলা। এবারের মেলা সাত থেকে ১০ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। আমরা চাই ব্যবসায়ীরা যেন পূর্বের ন্যায় এবারও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারেন। গত বছর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই খাজনা নির্ধারণ করা হয়েছিল, এবারও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। কোনো ব্যবসায়ীর ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হবে না। এবার মেলার ইজারা হয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। কালেকশন কম হলে বা লোকসান হলেও কমিটি সেটি বহন করবে। কারণ এটি আমাদের এলাকার রায়ের মেলা ও ঐতিহ্য।

​​এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, ‘মসূয়া ইউনিয়নের বৈশাখী মেলা যথাযথ নিয়মে ডাক দেওয়া হয়েছে। মেলা কমিটির মাধ্যমেই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ডাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গত বছর এই মেলার ইজারা মূল্য ছিল ৭১ হাজার ৭০০ টাকা। তবে অন্য বছরের তুলনায় এবছরের ডাকের মূল্য বেশি হয়েছে। তিনি আরো বলেন এটা কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়।

বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।

এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য: