শ্রীমঙ্গলে দেড়মাসব্যাপী ‘বই পড়া উৎসব-২০২৬’ শুরু
শ্রীমঙ্গলে দেড়মাসব্যাপী ‘বই পড়া উৎসব-২০২৬’ শুরু
দেওয়ান মাসুকুর রহমান, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার:
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বইপড়ার সংস্কৃতি বিকাশ, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা এবং নতুন প্রজন্মকে মোবাইলনির্ভরতা থেকে বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়েছে ‘বই পড়া উৎসব-২০২৬’।
উপজেলা প্রশাসন, শ্রীমঙ্গলের আয়োজনে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকাল ১০টায় শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এ উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. কামাল উদ্দিন কামাল। তিনি বই পড়ার বিকল্প নেই উল্লেখ করে বলেন, নিজের নিরন্তর উন্নতির জন্য বই পড়তেই হবে।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান। “তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দেখে আমি মুগ্ধ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বই পড়ে কেউ দেউলিয়া হয় না। আজকের রিডার ভবিষ্যতের লিডার।”
এছাড়াও ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অয়ন চৌধুরী, নটরডেমে স্কুল এন্ড কলেজের প্রিন্সিপাল ফাদার প্রশান্ত নিকোলাস, শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিমল কান্ত দাশ, দি বাডস রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক সুপর্ণা দেবনাথ ও শিক্ষক রাশেদ আহমেদ, শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপরাজিতা বর্ধন অপি ও উম্মে কুলসুম মিম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষানুরাগী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের উৎসবে উপজেলার মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীসহ উন্মুক্ত বিভাগ মিলিয়ে ২৫ হাজারেরও বেশি প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে উপজেলার ৩৮টি মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী সরাসরি বিভিন্ন ধাপে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে।
উৎসবটি চারটি বিভাগে পরিচালিত হচ্ছে। ‘ক’ বিভাগে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি, ‘খ’ বিভাগে নবম ও দশম শ্রেণি, ‘গ’ বিভাগে একাদশ শ্রেণি থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তরসহ তদূর্ধ্ব পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং ‘ঘ’ বিভাগে শ্রীমঙ্গল উপজেলার যে কোনো বয়সের বইপ্রেমী সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
আয়োজকরা জানান, উৎসবটি তিনটি ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। ধাপগুলো হলো— মুকুল, ফুল ও ফল। প্রতিটি ধাপে অংশগ্রহণকারীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে নির্বাচিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, জীবনী কিংবা অন্যান্য সাহিত্যগ্রন্থ পড়তে হবে। বই পাঠ শেষে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাই করে পরবর্তী ধাপে উন্নীত করা হবে।
প্রথম ধাপ ‘মুকুল’-এর জন্য ইতোমধ্যে আয়োজকরা বিভিন্ন শ্রেণির উপযোগী করে মোট ১৫টি বইয়ের একটি নির্বাচিত পুল তৈরি করেছেন। প্রতিটি শ্রেণির জন্য নির্ধারিত দুটি বই থেকে শিক্ষার্থীরা বই পড়ে আগামী ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেবে।
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা দ্বিতীয় ধাপ ‘ফুল’-এ অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। এ ধাপে তাদের জন্য নতুন একটি বই নির্ধারণ করা হবে। নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওই বইয়ের ওপর মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সেরা পাঠকদের চূড়ান্ত ধাপ ‘ফল’-এর জন্য নির্বাচন করা হবে।
চূড়ান্ত ধাপ ‘ফল’ উপজেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে। এ পর্যায়েও প্রতিযোগীদের জন্য নতুন একটি বই নির্ধারণ করা হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নির্বাচিত প্রতিযোগীরা উপজেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত মূল্যায়নে অংশ নিয়ে সেরা পাঠক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
অর্থাৎ একজন প্রতিযোগীকে পুরো উৎসবজুড়ে তিনটি পৃথক বই পাঠ করতে হবে এবং প্রতিটি বইয়ের ওপর ধারাবাহিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে নিজেদের পাঠদক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সাহিত্যবোধের পরিচয় দিতে হবে।
আয়োজকরা বলছেন, শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, চিন্তা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিমনস্ক একটি প্রজন্ম তৈরি করা। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইলনির্ভর বিনোদনের কারণে শিশু-কিশোরদের বই থেকে দূরে সরে যাওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এই উৎসব সেই প্রবণতা পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশাবাদী।
বিশেষত্ব হলো, এবারের উৎসবে প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত বিভাগ রাখা হয়েছে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা শ্রীমঙ্গল উপজেলার যে কোনো বয়সের বইপ্রেমী ব্যক্তি এ উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বইপাঠের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রায় দেড় মাসব্যাপী চলা এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বই সংগ্রহ, পাঠচক্র, আলোচনা এবং পাঠ-প্রস্তুতির উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে পুরো উপজেলায় বইপাঠকে ঘিরে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।
উৎসব বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসনকে সমন্বয় সহযোগিতা করছে শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব, আর পাঠ সহযোগী হিসেবে রয়েছে উত্তরণ, শ্রীমঙ্গল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত আয়োজন করা গেলে পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি বইকে কেন্দ্র করে একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৃজনশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের আহবান
##
বইপড়ার সংস্কৃতি বিকাশ, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা এবং নতুন প্রজন্মকে মোবাইলনির্ভরতা থেকে বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘বই পড়া উৎসব আয়োজনের সফলতা কামনা করে বলেছেন, “জ্ঞান, মনন ও সৃজনশীলতার এই উজ্জ্বল যাত্রায় এই উৎসবে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে। জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘আলোকিত মানুষ গড়ার’ আন্দোলন আরও বেগবান হবে।”
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল যুগে বইয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক আরও গভীর করতে এবং বর্তমান প্রজন্মকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করতে এ ধরনের উৎসব একটি সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ।
সর্বশেষ
- প্রকাশক ও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ বার্তা সম্পদাক : মোঃ জাকির হোসেন
- আইটি ইনর্জাচ : আসমা-উল-হুসনা মোবাইল : 01737208208
Developed by bditsupport



