বৃহস্পতিবার ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভ্যানচালকের মেয়ে থেকে জাতীয় নারী ফুটবল দলের গোলরক্ষক : ফেরদৌসি আক্তার সোনালীর অনুপ্রেরণার গল্প

17 August, 2025 1:10:25
ভ্যানচালকের মেয়ে থেকে জাতীয় নারী ফুটবল দলের গোলরক্ষক : ফেরদৌসি আক্তার সোনালীর অনুপ্রেরণার গল্প

ডেক্স রিপোর্টঃ ১৭ আগস্ট রবিবার ২০২৫।

প্রান্তিক গ্রামের এক ভ্যানচালকের মেয়ে ফেরদৌসি আক্তার সোনালী। সংসারে অভাব, চারপাশের কটু মন্তব্য আর সীমাহীন সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই বেড়ে ওঠা এই কিশোরী আজ বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের গোলরক্ষক। দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও অদম্য পরিশ্রমের জোরে তিনি পৌঁছেছেন স্বপ্নের শিখরে।

শৈশবের সীমাহীন প্রতিবন্ধকতা

সোনালীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বনগ্রামে। বাবা ফারুক ইসলাম জীবিকা নির্বাহ করেন ব্যাটারি চালিত ভ্যান চালিয়ে, মা মেরিনা বেগম গৃহিণী। সংসারের সম্পদ বলতে মাত্র সাত শতক ভিটেমাটি। তিন ভাইবোনের মধ্যে সোনালী সবচেয়ে বড়। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তার আলাদা আগ্রহ ছিল। কিন্তু গ্রামীণ সমাজে মেয়েদের মাঠে নামা অনেকের চোখে ‘অশোভন’ কাজ। ফলে সোনালীকে প্রায়শই শুনতে হয়েছে কটূ কথা। তবে তিনি দমে যাননি।

মাঠে প্রথম পদচারণা

স্থানীয় গইচপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ফুটবলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তার। বিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় গোলপোস্টে দারুণ সাফল্য এনে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। পরবর্তীতে হাড়িভাসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলে আন্তঃবিদ্যালয় টুর্নামেন্টে নিয়মিত খেলতে শুরু করেন। সেখান থেকেই তার ফুটবল ক্যারিয়ারের প্রকৃত সূচনা।

টুকু একাডেমিতে অনুশীলন

পঞ্চগড় শহরের টুকু ফুটবল একাডেমি স্থানীয় প্রতিভা গড়ে তোলার কাজ করছিল। একাডেমির পরিচালক টুকু রেহমান স্মৃতিচারণ করে বলেন, “সোনালী খুবই সম্ভাবনাময়ী ছিল। প্রতিদিন খাওয়া-না খেয়েও অনুশীলনে আসতো। তার চোখেমুখে বড় স্বপ্ন ঝলমল করত। আমি বুঝতাম একদিন সে অনেক দূর যাবে।”

তবে এই যাত্রা সহজ ছিল না। পরিবার ও গ্রামবাসীর অনেকেই নিরুৎসাহিত করতেন—“মেয়ে মানুষ ফুটবল খেলবে?” সংসারে খাওয়ার কষ্ট থাকলেও খেলাধুলায় সময় দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলতেন অনেকে। কখনো কখনো বাবা-মাও নিরুৎসাহিত করেছেন। কিন্তু সোনালী ছিলেন অনড়।

পরিবারের সংগ্রাম ও সমর্থন

বাবা ফারুক ইসলাম বলেন, “অনেক সময় বলতাম সংসারে সাহায্য করো। কিন্তু সে একরোখা, ফুটবল ছাড়া কিছু শুনতো না। বড় কোনো সহায়তা করতে পারিনি, তবে তাকে বাঁধাও দেইনি।”
মা মেরিনা বেগম আবেগভরা কণ্ঠে যোগ করেন, “টাকার অভাবে অনেক দিন অনুশীলনে যেতে পারেনি। তবুও সে হাল ছাড়েনি। মেয়ের স্বপ্নটাই বড় ছিল।”

জাতীয় দলে ডাক

অদম্য পরিশ্রমের স্বীকৃতি মেলে ২০২৩ সালে। ভর্তি হন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি)। বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়ছেন এবং গোলরক্ষক হিসেবে কঠোর অনুশীলন চালাচ্ছেন। বিকেএসপিতে থাকাকালীন ডাক পান জাতীয় নারী ফুটবল দলে। সিনিয়র দলের হয়ে জর্ডানে খেলেন, যেখানে বাংলাদেশ দল চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর অনূর্ধ্ব-২০ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সাম্প্রতিক সময়ে লাওসে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ নারী এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে রানার্সআপ হওয়াও তার ক্যারিয়ারের অন্যতম অর্জন।

গর্বিত গ্রামবাসী

লাওস থেকে দেশে ফেরার পর বাবার ভ্যানে চড়ে জন্মভিটায় ফিরে আসেন সোনালী। তাকে একনজর দেখতে গ্রামে ভিড় জমে যায়। বাবা মিষ্টি বিতরণ করেন খুশি হয়ে। ফারুক ইসলাম বলেন, “আজ আমার মেয়ে দেশের হয়ে খেলছে। আমি গরীব মানুষ, কিন্তু ও আমার মুখ উজ্জ্বল করেছে। এর চেয়ে বড় আনন্দ নেই।”
মা মেরিনা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বলেন, “আমাদের অভাব ছিল, কিন্তু মেয়ে হাল ছাড়েনি। আজ জাতীয় দলে খেলছে—আমি বিশ্বাস করি, দেশের জন্য আরও বড় কিছু করবে।”

হাড়িভাসা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান গোবিন্দ চন্দ্র রায় বলেন, “অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা সোনালী আমাদের গর্ব। তার সাফল্য অন্য মেয়েদেরও অনুপ্রেরণা হবে। প্রশাসনের উচিত তার পরিবারকে সহযোগিতা করা।”

স্বপ্নের ডানা

নিজের লক্ষ্য প্রসঙ্গে সোনালী বলেন, “আমি চাই দেশের জন্য বড় কিছু করতে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভালো খেললে দেশের নাম উজ্জ্বল হবে। আমার চোখে এখন বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন।”

অভাবের ভ্যানচালকের মেয়ে থেকে জাতীয় দলের গোলরক্ষক হওয়া সোনালীর এই যাত্রা প্রমাণ করে—স্বপ্ন যদি শক্ত হয়, তবে দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক বাঁধা কোনো কিছুই থামাতে পারে না।

সর্বশেষ

  • প্রকাশক ও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ বার্তা সম্পদাক : মোঃ জাকির হোসেন
  • আইটি ইনর্জাচ : আসমা-উল-হুসনা মোবাইল : 01737208208
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় , ৩৭/৬, আজিমপুর রোড, আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫ ইমেইল : buletin247@gmail.com, 01711977369

Developed by bditsupport

PhotoCard Icon
Create PhotoCard