রণাঙ্গনের অক্ষর থেকে দাবানলের আগুন—স্মরণে খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল | বিডি-প্রেস 24 ডট কম
হোম / ইতিহাস / বিস্তারিত

রণাঙ্গনের অক্ষর থেকে দাবানলের আগুন—স্মরণে খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল

3 September 2026, 9:50:48

রণাঙ্গনের অক্ষর থেকে দাবানলের আগুন—স্মরণে খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে সাংবাদিকতার ময়দানে ছিলেন সত্য ও মানুষের অধিকারের নির্ভীক কণ্ঠ

মাফিকুল ইসলাম,দিনাজপুর,প্রতিনিধি :-

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে হাতে অস্ত্রের পাশাপাশি কলমকেও যাঁরা মানুষের মুক্তির সংগ্রামের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন, খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল তাঁদের অন্যতম। বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, সাবেক সংসদ সদস্য ও সংগঠক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকতা ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

আজ ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের এই দিনে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে রংপুরের মুন্সীপাড়া মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানে দাফন করা হয়।

১৯৪৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বালারহাট ইউনিয়নের বুজরুক ঝালাই গ্রামে জন্ম খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলের। বাবা এলএমএফ চিকিৎসক ডা. মোজাম্মেল হক খন্দকার এবং মা মাজেদা বেগম। কোনাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে তিনি কৈলাশরঞ্জন উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতি ও সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পাকিস্তানি শাসন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ১৯৬৪ সালে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ছয় মাস কারাভোগ করেন। পরে রংপুর কলেজে পড়াশোনার সময় ১৯৬৫-৬৬ সালে জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়েও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ছাত্রজীবনেই শ্রমিকদের সংগঠিত করে প্রতিষ্ঠা করেন রংপুর-দিনাজপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন। শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৭০ সালেও তাঁকে কারাভোগ করতে হয়।

মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালেও তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। ১৯৭১ সালের ১২ মার্চ রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে শ্রমিক জনসভায় পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীনতার পক্ষে শপথ নেন তিনি। ২৩ মার্চ শ্রমিকদের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চল থেকে পাকিস্তানি শাসকদের জন্য খাদ্যশস্য পরিবহন বন্ধের উদ্যোগ নেন।

পরবর্তীতে নিরাপত্তার কারণে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে সক্রিয় হন। সেখানকার মুক্তাঞ্চল থেকে ‘মুস্তফা করিম’ ছদ্মনামে প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক ‘রণাঙ্গন’। যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষের মনোবল বাড়াতে পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ই তিনি অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। ‘রণাঙ্গন’ প্রকাশনা ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত খন্দকার বদিউজ্জামান ও নুরুল ইসলাম ঢালী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সাংবাদিকতার সংগ্রাম থেকে সরে যাননি বাটুল। নানা প্রতিকূলতায় ‘রণাঙ্গন’ বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিষ্ঠা করেন সাপ্তাহিক ‘মহাকাল’। এরপর ১৯৮১ সালের ২৭ মে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দৈনিক দাবানল’। একের পর এক এসব প্রকাশনার মধ্য দিয়ে তিনি উত্তরাঞ্চলের সংবাদপত্র জগতে একটি শক্ত ভিত তৈরি করেন।

তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বহু সাংবাদিক পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাই তাঁর পরিচয় শুধু সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নয়; সাংবাদিক তৈরির কারিগর হিসেবেও তিনি অনন্য।

রাজনীতিতেও তাঁর ছিল সক্রিয় উপস্থিতি। ১৯৭৯ সালে মিঠাপুকুর আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মিঠাপুকুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন তিনি। রংপুর খেলাঘর, শিখা সংসদসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশেও অবদান রাখেন।

ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে সংসার করেছেন বাটুল। তাঁর বড় ছেলে খন্দকার মোস্তফা মোর্শেদ ব্যবসার পাশাপাশি ‘দৈনিক দাবানল’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে যুক্ত আছেন। ছোট ছেলে খন্দকার মোস্তফা সরওয়ার অনু পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাঁর মৃত্যুর ছয় বছর পরও উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকতা ও সামাজিক অঙ্গনে তাঁর অনুপস্থিতি অনুভূত হয়। তবে তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিকতার আদর্শ এবং মানুষের অধিকার নিয়ে তাঁর আজীবন সংগ্রাম এখনও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা।

রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যে কলমের যাত্রা শুরু হয়েছিল, মহাকাল পেরিয়ে সেই কলমের ধারই আজ দাবানলের অক্ষরে বহমান। সেই কারণেই খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একজন সম্পাদক বা প্রকাশকের চেয়েও বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন গণমানুষের পক্ষে দাঁড়ানো এক নির্ভীক কণ্ঠ।

বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।

এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য:

PhotoCard Icon
Create PhotoCard