মানসম্মত মজুরী বৃদ্ধির দাবীতে শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সংবাদ সম্মেলন
মানসম্মত মজুরী বৃদ্ধির দাবীতে শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সংবাদ সম্মেলন
দেওয়ান মাসুকুর রহমান, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৬ আগস্ট ২০২৬ :
প্রতি বছর ৫% মজুরী বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) প্রত্যাহার, নতুন মজুরী বোর্ড গঠন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন উপযোগী মানসম্মত মজুরী বৃদ্ধির দাবীতে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয় লেবার হাউসের হলরুমে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল। সংগঠনের সহসভাপতি পংকজ এ কন্দের সভাপতিত্বে এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জেসমিন আক্তার, সংগঠনের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী, সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বালিশিরা ভ্যালীর সভাপতি বিজয় হাজরা, সংগঠনের সিলেট ভ্যালী কার্যকরী কমিটির সভাপতি রাজু গোয়ালা, সংগঠনের মনু দলই কার্যকরী কমিটির সভাপতি ধনা বাউরী, সংগঠনের লংলা ভ্যালী কার্যকরী কমিটির সভাপতি সাইদুল ইসলাম, সংগঠনের মনু দলই ভ্যালী কার্যকরী কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল দাশ পাইনকা, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের দুলাল হাজরা, বিভিন্ন চা বাগানের পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরা সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সাবেক উপদেষ্টা, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; ‘৭১ টিভির জেলা প্রতিনিধি আহমেদ ফারুক মিল্লাদ, আরটিভির জেলা প্রতিনিধি চৌধুরী ভাস্কর হোম, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার প্রতিনিধি শিমুল তরফদার, গণমাধ্যম কর্মী রাজেশ ভৌমিক সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে উপস্থিত সকলকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন,
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা গ্রহন করবেন। দেশের অনান্য শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের তুলনায় চা শিল্পের কারিগর শ্রমিকদের দৈনিক / মাসিক মজুরী অত্যান্ত নাজুক। একটি মানসম্মত মজুরী যা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে সংগতিপূর্ন রেখে এবং আগত ভবিষ্যতে উন্নত জীবন গঠনের বিবেচনায় একটি মানসম্মত মজুরী নির্ধারন নিশ্চিত করবে সরকার, এই প্রত্যাশা রয়েছে চা শ্রমিকদের।
বাংলাদেশ চা বোর্ড এর ২০২৪-২০২৫ খ্রি: সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১৭৮টি চা বাগান রয়েছে। ১,৬৮,৮৫৩ একর ভূমি বিস্তৃত চা বাগানে প্রায় ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) জন নিবন্ধিত এবং ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার)’র বেশি শ্রমিক অনিবন্ধিত থেকে কাজ করে আসছে। চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা শিল্পে অবদান রাখলেও শিক্ষা, দক্ষতা, বিকল্প জীবিকা, ডিজিটাল ক্ষমতা, সামাজিক সুরক্ষায়, বাজার সংযোগ এখনোও উল্লেখযোগ্য ভাবে পিছিয়ে আছে। চা বাগান শ্রমিক ও তাদের পরিবারের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৬১.৯ শতাংশ এবং ৫২ শতাংশ চা জনগোষ্ঠী বহুবিধ দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। এই প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েই নিম্নতম মজুরী কাঠামো ঘোষণা অতিব জরুরী।
আপনারা অবগত হবেন যে, চা শিল্প সেক্টরে মজুরী নির্ধারণের জন্য বিগত সরকার কর্তৃক মজুরী বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বর্তমানে মজুরী বোর্ডের মেয়াদ শেষ, এমতাবস্থায় চা শ্রমিকদের জীবন-যাপন ব্যয়, জীবন-যাপনের মান, দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি, উন্মুক্ত আকাশের উচু-নিচু, খোলামাঠের কর্ম পরিবেশ, কর্মের ধরন, কর্মের ঝুঁকি ও মান, এই বাস্তাবসম্মত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন নিম্নতম মজুরী বোর্ড গঠন করার প্রস্তাব করছি। বিগত নিম্নতম মজুরী বোর্ড কর্তৃক চা শিল্প সেক্টরের জন্য বাৎসরিক মজুরী বৃদ্ধি ৫% (ইনক্রিমেন্ট) নির্ধারণ হয়ে আসছে, সেই ৫% বাৎসরিক মজুরী বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) বাতিল করে, বর্তমান বাজার দরের সাথে সংগতি রেখে একটি মানসম্মত মজুরী নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সরকার গঠন করার ৫ মাসের মাথায় চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল এসে চা শ্রমিকদের দুঃখ, দুর্দশার কথা শুনে চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। তাছাড়াও দীর্ঘ বিলম্বিত চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে গত ০৪ আগষ্ট ২০২৬খ্রি: মঙ্গলবার ৫০,০০,০০০/- (পঞ্চাশ লক্ষ) টাকা বরাদ্ধ করেছেন।
ইতিমধ্যে সরকারের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসক হতে চা জনগোষ্ঠীর জন্য চা-শ্রমিক উন্নয়ন একাডেমি স্থাপনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সরকারকে চা শ্রমিকদের পক্ষ হতে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
অবগত হবেন যে, চা শ্রমিকদের ভূমি বন্দোবন্তের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে ইউনিয়নের পক্ষ হতে লিখিত প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে সাক্ষাতে আলোচনার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।
তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আশাকরি, সমাজে পিছিয়ে পড়া চা জনগোষ্ঠীর বিষয়সমুহ উপলব্দী করে স্ব স্ব গণমাধ্যমসমূহে যথাযথ প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।
প্রতি বছর ৫% মজুরী বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) প্রত্যাহার, নতুন মজুরী বোর্ড গঠন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন উপযোগী মানসম্মত মজুরী বৃদ্ধির দাবীতে চা শ্রমিক ইউনিয়নের চলমান আন্দোলন সম্পর্কে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা শাখার সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেছেন, “আলাপ আলোচনার মাধ্যমে চা শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন উপযোগী যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করুন। এ নিয়ে কোনো তালবাহানা ও গড়িমসি গ্রহণযোগ্য না। শ্রমিকরা কারো দয়া চায় না। তারা দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রম দিয়ে অর্থনীতিতে যে মূল্য যুক্ত করে, তার পূর্ণ পারিশ্রমিক চায়।”
প্রতিক্রিয়ায় তিনি আরও বলেন, “সামান্য কিছু সুযোগ-সুবিধাসহ দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরিতে আট ঘন্টা, কখনো-বা আরো অধিক সময় ধরে কাজের বিপরীতে এই সামান্য পারিশ্রমিক শোষণ-বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থি। মজুরী বৃদ্ধিসহ অন্যান্য দাবীনামা নিয়ে দরকষাকষি ও আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাগান মালিকদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা পরিহার করতে হবে ও সরকারকেও চা-শ্রমিকদের দেশের নাগরিক হিসেবে গণ্য করে ন্যায্য ও মানবিক উদ্যোগ নিতে হবে।”
একইসাথে, চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সম-পর্যায়ের খাতের সর্বনিম্ন মজুরি বিবেচনায় নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন ধারণের উপযুক্ত ও চা-শ্রমিকদের নিকট গ্রহণযোগ্য ন্যায্য পারিশ্রমিক নির্ধারণে বাগান মালিক, বাংলাদেশীয় চা সংসদ, শ্রম অধিদপ্তর ও সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
প্রতি দুই বছর পরপর চা-শ্রমিক ও বাগান কর্তৃপক্ষের মধ্যে মজুরি সংক্রান্ত চুক্তি নবায়নের রীতি রয়েছে, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মজুরি নির্ধারণে বাস্তবে একতরফাভাবে বাগান কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তথাপি দীর্ঘদিন ধরে চা-শ্রমিকরা মজুরি চুক্তির বাইরে রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতির এই সময় চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মাত্র ৫% মজুরী বৃদ্ধির প্রস্তাব চা-শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি অবজ্ঞা ও নিছক উপহাসমূলক অধিকার লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছু নয় উল্লেখ করে তিনি বলছেন, চা-শ্রমিকদের প্রাপ্ত আবাসনসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় নিয়েও একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, দেশের অন্য যে-কোনো খাতের তুলনায় চা শ্রমিকদের মজুরি সর্বনিম্ন ও শোষণ-বৈষম্যমূলক। অথচ সার্বিক বিবেচনায় এ খাতটি অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, এখন পর্যন্ত কোনো পরিসংখ্যান বা তথ্য-উপাত্ত দিয়েও কেউ বলতে পারেননি যে, চা-বাগানের মালিক পক্ষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা এমন কোনো অবস্থায় আছেন যে, যাদের অবদানের ওপর নির্ভর করে চা-শিল্প বিকাশমান, সেই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রদানে তারা অক্ষম। বরং এটি একটি লাভজনক বাণিজ্যিক খাত। অন্যদিকে চা-শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরিসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু মালিকপক্ষের মর্জির ওপর ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। চা শ্রমিকদের দেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে চলমান আন্দোলনের যৌক্তিকতা অনুধাবনের পাশাপাশি সমতাভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে চা শ্রমিকদের নিকট গ্রহণযোগ্য মজুরি নির্ধারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
চা শ্রমিক ইউনিয়ন কর্তৃক উত্থাপিত নতুন মজুরী বোর্ড গঠনের দাবি প্রাসঙ্গিক উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “দেশের “ন্যূনতম মজুরি বোর্ড” অন্যান্য খাতের ন্যূনতম মজুরি যেখানে কয়েক গুণ বেশি নির্ধারণ করেছে, সেখানে কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের “গাইড লাইন” উপেক্ষা করে বারবার চা বাগান মালিক পক্ষের নির্ধারণ করা ন্যূনতম মজুরির হার বহাল রেখে শ্রম মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
সর্বশেষ
- প্রকাশক ও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ বার্তা সম্পদাক : মোঃ জাকির হোসেন
- আইটি ইনর্জাচ : আসমা-উল-হুসনা মোবাইল : 01737208208
Developed by bditsupport



