শনিবার ১৮ জুলাই, ২০২৬

প্রতিষ্ঠার ৩২ বছরেও মেলেনি সরকারি একাডেমিক ভবন, চলনবিলের নারীদের উচ্চশিক্ষার বাতিঘর রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজ

17 July, 2026 10:22:08
প্রতিষ্ঠার ৩২ বছরেও মেলেনি সরকারি একাডেমিক ভবন, চলনবিলের নারীদের উচ্চশিক্ষার বাতিঘর রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজ

মো.সজিবুর রহমান, নাটোর প্রতিনিধি:

চলনবিল অঞ্চলে একসময় মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ছিল বহু পরিবারের কাছে এক দূরূহ স্বপ্ন। সেই বাস্তবতা বদলাতে ১৯৯৪ সালে নাটোরের গুরুদাসপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজ। প্রতিষ্ঠার ৩২ বছর পেরিয়ে হাজারো শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো একটি সরকারি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ভবনের সুবিধা পায়নি। নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে ওঠা সীমিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করেই চলছে পাঠদান, পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ এবং চলনবিলের নারী শিক্ষার নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার কার্যক্রম। তবে অবকাঠামোগত সংকটের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম দিন দিন আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় একই কক্ষে একাধিক শিফটে ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। অনেক সময় একটি বেঞ্চে চার থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থীকে বসে পাঠ গ্রহণ করতে হয়। পরীক্ষার সময় সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তবু সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই নিয়মিত পাঠদান, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিজ্ঞান শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি চর্চা অব্যাহত রেখেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
কলেজ সূত্র জানায়, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এম. মোজাম্মেল হক প্রায় এক একর জমির ওপর নিজস্ব অর্থায়নে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল চলনবিল অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। ১৯৯৮ সালে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। ২০০১ সালে ডিগ্রি (পাস) কোর্স এবং ২০১৫ সালে পাঁচটি বিষয়ে চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স চালুর অনুমোদন পায়। বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি ও অনার্স মিলিয়ে প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন শতাধিক। একই সঙ্গে কলেজটি উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পাবলিক পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে কলেজের অধিকাংশ অবকাঠামো নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সরকারি একাডেমিক ভবন নির্মাণ না হওয়ায় শ্রেণিকক্ষ, একাডেমিক কার্যক্রম ও পরীক্ষা পরিচালনায় নিয়মিত সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা সিথি বলেন, “আমরা অনেক দূর থেকে এসে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করি। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় স্বাভাবিক পরিবেশে ক্লাস করা যায় না। একটি আধুনিক সরকারি একাডেমিক ভবন আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি।”
ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুস্মিতা রানী ও অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাইশা বলেন, “আমাদের পরিবারের পক্ষে শহরে থেকে পড়াশোনা করানো সম্ভব নয়। এই কলেজে বিনা বেতনে পড়াশোনা ও স্বল্প খরচে আবাসিক সুবিধা পাওয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছি। সরকারি ভবন হলে শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে।”
গুরুদাসপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিদ্যুৎ কুমার সরকার বলেন, “ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক কলেজে সরকারি ভবন হয়েছে। অথচ উপজেলা সদরের একমাত্র নারী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ৩২ বছরেও একটি সরকারি একাডেমিক ভবন পায়নি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।”
কলেজটিতে শিক্ষার্থীরা বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ পান। পাশাপাশি নামমাত্র খরচে আবাসিক সুবিধাও রয়েছে। ফলে গুরুদাসপুর ছাড়াও সিংড়া, তাড়াশ, বড়াইগ্রাম, ভাঙ্গুড়া ও চাটমোহরসহ চলনবিলের বিভিন্ন এলাকার কৃষক, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মেয়েরা এখান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।
কলেজে রয়েছে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব এবং সিসিটিভি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবে প্রয়োজনীয় একাডেমিক ভবন এবং আসবাবপত্রের  অভাব সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।
বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান বলেন, “শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা হলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের সংকট তীব্র হচ্ছে। একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মিত হলে শিক্ষার গুণগত মান আরও উন্নত হবে।”
উপাধ্যক্ষ মো. আবুল কালাম বলেন, “একসময় চলনবিল অঞ্চলে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। যোগাযোগ ও নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক পরিবার মেয়েদের বাইরে পাঠাতে চাইত না। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার পর সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে।”
অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন বলেন, “সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কলেজটি ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল করছে। সরকারের সহযোগিতায় একটি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ভবন নির্মিত হলে নারী শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠানটি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।”
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, “কলেজটির অবকাঠামোগত সংকট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ বলেন, “রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজের সরকারি একাডেমিক ভবনের বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, চলনবিল অঞ্চলে নারী শিক্ষার প্রসারে রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তাই শিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে দ্রুত একটি সরকারি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ভবন নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ

  • প্রকাশক ও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ বার্তা সম্পদাক : মোঃ জাকির হোসেন
  • আইটি ইনর্জাচ : আসমা-উল-হুসনা মোবাইল : 01737208208
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় , ৩৭/৬, আজিমপুর রোড, আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫ ইমেইল : buletin247@gmail.com, 01711977369

Developed by bditsupport