রবিবার ১২ জুলাই, ২০২৬

নবীনগরের ঐতিহ্যবাহী ফল বিলম্বী বিলুপ্তির পথে

11 July, 2026 11:02:54
নবীনগরের ঐতিহ্যবাহী ফল বিলম্বী বিলুপ্তির পথে

সঞ্জয় শীল, নবীনগর ( ব্রাহ্মণবাড়িয়া ) প্রতিনিধি :

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী টক ফল ও সবজি বিলম্বী । এটি রসালো ও মূখরোচক। ফলটি তরকারিতে অপূর্ব স্বাদ এনে দেয়।
নবীনগর ব্যতিত বাংলাদেশের অন্য কোথাও বিলম্বী ফল সাধারণত চোখে পড়ে না। মায়ানমার বা তৎকালিন বার্মার খুব কাছাকাছি হওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সীমিত আকারে এ ফল হয় বলে জানা যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তি উদ্যোগে লাগানো হচ্ছে এ ফল গাছটি। কাচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ রঙের হয় ও পাকা অবস্থায় হলুদাভবর্ণ ধারণ করে। তেঁতুল বা আমলকির মতো কড়া টক।

বিলম্বী অক্সিডেসি গোত্রের অর্ন্তগত একটি উদ্ভিদ। বিলম্বী ও কামরাঙ্গা একই গোত্রের ফল। বিলম্বীর বৈজ্ঞানিক নাম এভারোয়া বিলিম্বী এবং ইংরেজিতে কিউকামবার ট্রি বা ট্রি সরিল নামেও পরিচিত।
বিলম্বী দেখতে অনেকটা পটেলের মতো। এটি লম্বায় ৩ থেকে ৬ সেমি পর্যন্ত হয়। বিলম্বীর উৎপত্তি সর্ম্পকে জানা যায় এটি খুব সম্ভবত ইন্দোশিয়ায় প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায় তবে অনেক উদ্ভিদবিদের মতে এর উৎপত্তিস্থল ব্রাজিল ও দক্ষিন এশিয়ার ইন্দোনিশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমার। বিলম্বী গাছটি উচ্চতায় প্রায় ৫ ফুট থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত হয়। । বিলম্বী বারো মাসি ফল। ফলটির ভেতরে বীজ হয়। গাছের ডালে সমাহার চিরল চিরল পাতার। একটি গাছ এক নাগাড়ে ফল দেয় ১৫ থেকে ২০ বছর। প্রতিটি ডালে প্রচুর ফল ধরে। একটি গাছ বর্ষায় আনুমানিক ৬০ কেজি এবং শীতেকালে ৩০ কেজি পরিমানের ফল দিতে পারে। তবে ভালো ভাবে যত্ম নিলে ৩০০ কেজির উপরও ফলন হয়। গোড়ায় পানি জমলে বা বর্ষার পানিতে এ গাছ মারা যায়। বিলম্বীর চারা হয় বীজ থেকে। তিন বছরে ফল ধরে। ফুল থেকে ফল হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে খাওয়ার উপযোগী হয়। গাছ থেকে পাকা বিলম্বী ফল পড়ার কয়েকদিনের মধ্যে পচে যায় এ ফল। গাছের পাতা ছেঁটে দিলে ফলন বেশি হয়।
বিলম্বী গাছের ফল ও পাতা বিভিন্ন দেশে ঔষধি কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিলম্বীর পাতা চর্মরোগ, যৌন রোগ, কিডনীর সমস্যায়,  বিষধর প্রাণীর কামড়ের থেকে নিরাময়ের জন্য,  জন্ম টনিক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ফিলিপাইন, মায়ানমারে ব্যবহৃত হয়। তবে এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।

বিলম্বী ফলের রয়েছে আমিষ ০.৬১ গ্রাম, তন্ত ০.৬ গ্রাম, ফসফরাস ১১.১ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩.৪ মিলিগ্রাম, লৌহ ১.০১ মিলিগ্রাম, ক্যারোটিন ০.০৩৫ মিলিগ্রাম, এসকোরবিক এসিড ১৫.৫ মিলিগ্রাম ও অন্যান্য পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। বিলম্বী ভারতের তামিলনাড়–, মহারাষ্ট্র ও কেরালায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়। এ ফল মাছের তরকারি আর ডালে ব্যবহৃত হয় বেশি। তাছাড়া এ ফল দিয়ে আচারও করা যায় । স্থানিয় বাজারে প্রতি কেজি বিলম্বী ৩০/৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

নবীনগরে বিলম্বী গাছ সংগ্রহের ইতিহাস ভারতবর্ষের ইতিহাসের সাথে জড়িত। যখন বাংলাদেশ সহ ভারতবর্ষের প্রায় প্রতিটি দেশের একে অপরের সাথে অবাধ যোগাযোগ ছিল। প্রায় ৯৫ বছর আগে স্থানীয় মুন্সেফ আদালতের চাপরাশি নরেন্দ্র চন্দ্র মোদী মায়ানমার তথা বার্মা থেকে নবীনগর ডাকঘরের তৎকালিন পোস্ট মাস্টার ইয়াকুব আলী চৌধুরীর ব্যক্তিগত বাগিচার জন্য ‍উপহার হিসেবে আনেন বিলম্বীর চারা। নরেন্দ্রের আনা একটি গাছ এখন নবীনগরের আনাচে-কানাচে সব জায়গা পাওয়া যায়।

এছাড়া নবীনগরের বিভিন্ন নার্সারীতে বানিজ্যিক ভাবে বিক্রির জন্য চারা উৎপাদন করা হয়। বর্তমান বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিলম্বী ফল পাওয়া যায় নবীনগরে। এখানকার হাট-বাজারে বিলম্বীর চারা কিনতে পাওয়া যায়। প্রতিটি চারা ৪০/৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বানিজ্যিক ভিত্তিতে বিবেচনা করা যেতে পারে তরকারি এবং আচার হিসেবে বিলম্বীর সম্ভাবনাকে। নবীনগরবাসীর প্রাণের দাবি এই ফলটিকে যেন বানিজ্যিক ভাবে রপ্তানি করা যায় সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানান। নবীনগরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এই ফল গাছটি থাকায় এর উৎপাদনও অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৃষি বিভাগের সামান্য একটি উদ্যোগ এই ফলটির বানিজ্যিক রপ্তানি ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

ছোট গল্পাকার সুমনা দেবনাথ কৃষ্ণা বলেন, এক সময় নবীনগর ‍উপজেলা থেকে ছড়িয়ে পড়া বিলম্বী গাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। আগে বাড়ি-ঘরের আনাচে-কানাচে কিংবা সদর দরজার সামনে দেখা যেতো বিলম্বী গাছ। বাড়ির নারীদের টক খাওয়ার ইচ্ছে হলে হাতের নাগালে থাকা বিলম্বী ফল গুড়া মরিচ ও লবন দিয়ে কাঁচা খেতো। মসুর ডালের সাথে বিলম্বী দিলে বেশ সুস্বাদু হতো ডাল। এখন তো দিন দিন বিলুপ্তির পথে বিলম্বী গাছ।

কাজী কামরুল হাসান টুটুল বলেন, শত বছর আগে মায়ানমার থেকে আনা বিলম্বী গাছ আমাদের ঐতিহ্য হয়ে উঠেছিলো। দিন দিন নগারায়নের ফলে হারাতে বসেছে এ ফল গাছটি। সামাজিক ও কৃষি কর্মকর্তাদের  একটি উদ্যোগ-ই রুখতে পারে বিলম্বীর বিলুপ্তি।

 

নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, বিলম্বী গাছ গাছ রোপনে বেশি জায়গার প্রয়োজন নেই। বিলম্বী ফল সবজি ও আচার হিসেবে খাওয়া যায়। এই ফলটির একটি বানিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে।

সর্বশেষ

  • প্রকাশক ও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ বার্তা সম্পদাক : মোঃ জাকির হোসেন
  • আইটি ইনর্জাচ : আসমা-উল-হুসনা মোবাইল : 01737208208
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় , ৩৭/৬, আজিমপুর রোড, আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫ ইমেইল : buletin247@gmail.com, 01711977369

Developed by bditsupport