দেশীয় প্রযুক্তিতে নৌবাহিনীর নির্মিত টাগবোট ‘টিয়াখালী-৪’ লঞ্চিং: জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন মাইলফলক
দেশীয় প্রযুক্তিতে নৌবাহিনীর নির্মিত টাগবোট ‘টিয়াখালী-৪’ লঞ্চিং: জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন মাইলফলক

ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ
খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড কর্তৃক পায়রা বন্দরের জন্য নির্মিত ৭০ টন বোলার্ড পুল ক্ষমতার অত্যাধুনিক টাগবোট ‘টিয়াখালী-৪’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে, যা দেশের ব্লু-ইকোনমি ও সামুদ্রিক সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড (কেএসওয়াই) কর্তৃক নির্মিত অত্যাধুনিক টাগবোট ‘টিয়াখালী-৪’ আনুষ্ঠানিকভাবে লঞ্চিং করা হয়েছে। নৌবাহিনী পরিচালিত এই শিপইয়ার্ডটি ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে নিজস্ব সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ প্রদর্শনের মাধ্যমে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য এই বিশেষায়িত জলযানটি প্রস্তুত করেছে।
লঞ্চিং অনুষ্ঠানে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. আব্দুল লতিফ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই অর্জনকে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের এক অনন্য সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেন।
মূলত পায়রা বন্দরের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক কার্যক্রম ও জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৭০ টন বোলার্ড পুল ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি টাগবোটের প্রকল্পের অংশ হিসেবে এটি দ্বিতীয় ও সর্বশেষ টাগবোট হিসেবে যুক্ত হলো, যা বন্দরের সক্ষমতাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করবে।
সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান Navnautic Private Limited-এর নকশায় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ব্যুরো ভেরিটাস (BV)-এর কঠোর তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই টাগবোটটি দৈর্ঘ্যে ৩৭ মিটার এবং এর ডিসপ্লেসমেন্ট ১,১০০ টন। ৫ মিটার ড্রাফট বিশিষ্ট এই নৌযানটিতে আধুনিক জেড-ড্রাইভ প্রপালশন সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে, যা এর গতিশীলতা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে অত্যন্ত কার্যকর করে তুলেছে।
টাগবোটটির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, উদ্ধার তৎপরতা, আন্ডারওয়াটার সার্ভে এবং উদ্ধারকারী বা স্যালভেজ কার্যক্রম পরিচালনার উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মতে, এই টাগবোটটি প্রতিকূল সামুদ্রিক আবহাওয়ায় এবং ভারী জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বন্দরের কার্যক্রমে যে জটিলতা তৈরি হয়, তা নিরসনে সরাসরি ভূমিকা রাখবে এবং বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
খুলনা শিপইয়ার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, টাগবোটটি নির্মাণে দেশীয় প্রকৌশল জ্ঞান ও দক্ষ জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় শিপইয়ার্ডের গ্রহণযোগ্যতা ও সক্ষমতার বার্তা দিচ্ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছে যে, ‘টিয়াখালী-৪’-এর অন্তর্ভুক্তি বন্দর এলাকায় জাহাজের বার্থিং ও আনবার্থিং প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের যে সীমাবদ্ধতা ছিল, তা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে। বর্তমানে পায়রা বন্দরে ক্রমবর্ধমান পণ্যবাহী জাহাজের চাপ সামলাতে এই ধরনের শক্তিশালী টাগবোটের প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিহার্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সরকারি পর্যায়ে এই ধরনের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব কারিগরি জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার যে ধারা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে দেশের জাহাজ নির্মাণ খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘টিয়াখালী-৪’ কেবল একটি জলযান নয়, বরং এটি দেশের ক্রমবর্ধমান ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতিকে বেগবান করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সমুদ্রভিত্তিক অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় এই ধরনের উন্নত প্রযুক্তিগত সংযোজন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত এই টাগবোটটি দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বন্দর কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে, যা ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য বন্দরের জন্যও একটি আদর্শ মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।
এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
























মন্তব্য: