কিশোরগঞ্জে রোগীর স্বজনকে আটকে মারধরের অভিযোগ ডা.মৌ-এর বিরুদ্ধে; ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
কিশোরগঞ্জে রোগীর স্বজনকে আটকে মারধরের অভিযোগ ডা.মৌ-এর বিরুদ্ধে; ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
এ.এস.এম হামিদ হাসান, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
কিশোরগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনকে কক্ষে আটকে শারীরিক লাঞ্ছনা ও হাসপাতালের কর্মচারীদের দিয়ে মারধর করানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা.ইসরাত জাহান মৌ-এর উপস্থিতিতে ঘটা এই ঘটনার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এদিকে ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত শনিবার (১৩ জুন) সকালে হাসপাতালের বহির্বিভাগের ১৩৭ নম্বর কক্ষে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে।
ভুক্তভোগী মো.উবায়দুল্লাহ কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামের আব্দুস বাছেদের ছেলে। অন্যদিকে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. ইসরাত জাহান মৌ ওই হাসপাতালের চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে উবায়দুল্লাহ তার অসুস্থ স্ত্রী ও আট মাস বয়সী শিশুসন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসেন। নির্ধারিত চিকিৎসক সময়মতো উপস্থিত না থাকায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি মোবাইল ফোনে একটি ভিডিও ধারণ করেন এবং অন্য রোগীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। চিকিৎসকের সহকারী বিষয়টি ডা. মৌ-কে জানালে প্রায় দুই ঘণ্টা পর সকাল ১১টার দিকে তিনি কক্ষে আসেন।
ভুক্তভোগী উবায়দুল্লাহ বলেন ”আমি কক্ষে প্রবেশ করার পরপরই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। চিকিৎসক আমার পরিচয় জানতে চান এবং ভিডিও ধারণের কারণ জিজ্ঞেস করে সেটি মুছে ফেলতে চাপ দেন। একপর্যায়ে চিকিৎসকের নির্দেশে হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ আমাকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করেন। এমনকি চিকিৎসক নিজেও আমার জামার কলার ধরে টানাহেঁচড়া করেন এবং গলা চেপে ধরেন।”
এ সময় কক্ষে থাকা তার অসুস্থ স্ত্রী ও কোলে থাকা আট মাসের শিশুসন্তান ভয়ে চিৎকার ও কান্না করতে থাকে। পরে বাইরে থাকা অন্য রোগীরা এগিয়ে এসে দরজা খোলার চেষ্টা করলে উবায়দুল্লাহ সেখান থেকে বের হতে সক্ষম হন। ঘটনার পরপরই তিনি কিশোরগঞ্জ সিভিল সার্জন বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, হঠাৎ করেই ১৩৭ নম্বর কক্ষের ভেতর থেকে উচ্চশব্দ ও মারধরের আওয়াজ শোনা যায়। দরজা বন্ধ থাকায় বাইরে থাকা সাধারণ রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিছু সময় পর দরজা খোলা হলে একজন ব্যক্তিকে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ও উত্তেজিত অবস্থায় বের হতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডা.ইসরাত জাহান মৌ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে জেলখানা মোড় এলাকায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন তিনি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব অবহেলা করে রোগীদের নিজের ব্যক্তিগত ক্লিনিকে (ডা. ইসরাত জাহান মৌ স্কিন অ্যান্ড লেজার কেয়ার সেন্টার) ভাগিয়ে নেওয়ার অসংখ্য পুরোনো অভিযোগ রয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ইয়াজ ইবনে জসিম বলেন: ”সরকারি হাসপাতালে এসে যদি সাধারণ মানুষ এভাবে হেনস্তা ও মারধরের শিকার হয়, তবে মানুষের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না। আমরা অবিলম্বে এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করে দোষী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাল্টা দাবি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. ইসরাত জাহান মৌ মারধরের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন:
”অভিযোগকারী উবায়দুল্লাহ হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভিডিও ধারণ করছিলেন এবং সিরিয়াল অমান্য করে জোরপূর্বক আমার কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় কক্ষে থাকা অন্য রোগীদের সঙ্গেই তার বাকবিতণ্ডা হয়। তিনি প্রথমে আমার সাহায্যকারীকে এবং পরে আমাকেও ধাক্কা দেন।”
তার বিরুদ্ধে আনা কলার ধরা বা গলা চেপে ধরার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি সদর মডেল থানায় একটি লিখিত পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেছেন।
এদিকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক) ডা. নূর মো. শামসুল আলম দাবি করেন, রোগীর স্বজনকে মারধরের অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। উল্টো অভিযোগকারী উবায়দুল্লাহই চিকিৎসকের সঙ্গে অসদাচরণ করেছেন এবং তার ওপর হামলা চালিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডা.মো. নাজমুল করিম জানান, এই ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম ভূঁইয়া জানান, ভুক্তভোগী ওবায়দুল্লাহ থানায় এসেছিলেন। তাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত চিকিৎসকও থানায় একটি লিখিত পাল্টা অভিযোগ দিয়েছেন। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সর্বশেষ
- প্রকাশক ও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ বার্তা সম্পদাক : মোঃ জাকির হোসেন
- আইটি ইনর্জাচ : আসমা-উল-হুসনা মোবাইল : 01737208208
Developed by bditsupport



