লবণাক্ততার সংকটে উপকূলের মাটি, জল ও জীবন: টেকসই সমাধানের খোঁজে কর্মশালা
লবণাক্ততার সংকটে উপকূলের মাটি, জল ও জীবন: টেকসই সমাধানের খোঁজে কর্মশালা

শ্যামনগর(সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি ঃ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, কৃষি উৎপাদন হ্রাস, সুপেয় পানির সংকট, জলাবদ্ধতা ও প্রাণবৈচিত্র্যের অবক্ষয় মোকাবিলায় স্থানীয় জ্ঞান ও কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যাভিত্তিক টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বানের মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে “মাটি, জল, জীবন: লবণাক্ত উপকূলের বাস্তবতা” শীর্ষক কর্মশালা|
মঙ্গলবার(১৮ আগস্ট) সকালে উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পাকড়াতলীআটি গ্রামের কাকলী রাণীর বাড়িতে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়| এতে কৃষক, নারী, যুব প্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
কর্মশালার শুরুতে জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক অল্পনা রাণী মিস্ত্রী এবং শ্রীফলকাটি এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক গোবিন্দ মণ্ডল উপকূলের মাটি ও পানির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা বলেন- লবণাক্ততার বিস্তার শুধু কৃষি উৎপাদনকেই বাধাগ্রস্ত করছে না| একই সঙ্গে মাটির উর্বরতা, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, মাছ ও দেশীয় প্রাণবৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটির গুণাগুণ ও প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
কর্মশালায় পানি সংকট, পানির ব্যবহার ও সংরক্ষণ, পুকুর,খাল রক্ষা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার এবং লবণাক্ততা মোকাবিলায় স্থানীয় কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন- লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় চাষাবাদের সুযোগ কমে যাচ্ছে। স্থানীয় জাতের বীজ ও মাছের ˆবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে এবং নিরাপদ পানির সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগ উপকূলের মানুষের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছ।
আলোচনায় এসব সংকট মোকাবিলায় কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যাভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ, স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ, জৈব সার ও জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, অ-চাষকৃত উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয় কর্মশালায়।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে “মাটি ও জলের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক” বিষয়ে দলীয় কাজ করেন। কৃষি, মাছ, প্রাণিসম্পদ, জীবিকা, খাদ্য ও পুষ্টির ওপর মাটি ও পানির পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পরে স্থানীয় জ্ঞান ও অভিযোজন কৌশল নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হয়। এতে স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ, ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহার, মালচিং পদ্ধতি, উঁচু বেড তৈরী পানি সংরক্ষণ এবং লবণসহিষ্ণু ফসল চাষের মতো কার্যকর কৌশলগুলো উঠে আসে।
“সমস্যা থেকে সমাধান—আমরা কী করতে পারি?” শীর্ষক দলীয় কাজ পর্বে অংশগ্রহণকারীরা উপকূলের প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সম্ভাব্য সমাধান নির্ধারণ করেন। তাঁরা মনে করেন- মাটি ও পানির সংকট মোকাবিলায় শুধু কৃষকের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কর্মশালাটি উপকূলীয় মানুষের মধ্যে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে অংশগ্রহণকারীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।
এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
























মন্তব্য: