নীরব প্রশাসন, প্রশ্নের মুখে শিক্ষার অধিকার,যবিপ্রবিতে ডাকযোগে পাঠানো চিঠি ঘিরে নতুন বিতর্ক
সাকিব আহসান এর বিশেষ প্রতিবেদনঃ
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের অধিকার সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এ ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—একজন শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক অতীত কি তার শিক্ষা গ্রহণের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে?
গত ১৮ মে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য ও বিভিন্ন অনুষদের ডিনদের কাছে ডাকযোগে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল এমন শিক্ষার্থীদের “শিক্ষার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার” দাবি জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তর চিঠিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণও করেছে এবং প্রেরকের হাতে গ্রহণ রশিদ রয়েছে। কিন্তু ঘটনার পর থেকে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকায় তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মেরুকরণ নতুন কিছু নয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সামাজিক, প্রশাসনিক কিংবা একাডেমিক চাপে পড়তে হয়েছে—এমন অভিযোগ অতীতেও এসেছে। তবে শিক্ষার অধিকার প্রশ্নটি সবসময়ই একটি মৌলিক মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে কোনো শিক্ষার্থী অপরাধে অভিযুক্ত হলে তার বিচার হতে পারে, কিন্তু শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হলে সেটি আইনি ও নৈতিক উভয় প্রশ্নই তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বর্তমান নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। কারণ, একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি গ্রহণের পর প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগ বা দাবির বিষয়ে অন্তত একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করা। সেটি হতে পারে তদন্ত কমিটি গঠন, আলোচনার উদ্যোগ অথবা লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান। কিন্তু সম্পূর্ণ নীরবতা সাধারণত দুই ধরনের সংকেত দেয়—প্রথমত, প্রশাসন বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইছে; দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ চাপ বা রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করছে।
শিক্ষা অধিকারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার জায়গা নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরও প্রতিফলন। সেখানে মতাদর্শগত বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেলে সেটি প্রতিশোধমূলক সংস্কৃতির জন্ম দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
অন্যদিকে, প্রশাসনের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে দাবি করছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে অনেক সিদ্ধান্ত “সংবেদনশীল নিরাপত্তা বিবেচনা” থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি কোনো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি বা বিশ্ববিদ্যালয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক; কিন্তু সামষ্টিকভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অধিকার সীমিত করা কেন?
ঘটনাটি এখন কেবল কয়েকজন শিক্ষার্থীর দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইনের শাসন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে চিঠি গ্রহণের প্রমাণ থাকার পরও প্রশাসনের নীরবতা অনেকের কাছে “ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল” হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তারা কি বিষয়টি স্বচ্ছ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে যাবে, নাকি নীরব থেকে বিতর্ক আরও বাড়তে দেবে। কারণ ইতিহাস বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে চাপা দেওয়া প্রশ্ন একসময় আরও বড় সংকট হয়ে ফিরে আসে।
বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।
এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
