শতবর্ষের খাল দখলে বন্ধ পানিপ্রবাহ, দুর্ভোগে ঈশ্বরগঞ্জবাসী

20 April 2026, 1:29:59

মিয়া সুলেমান, ঈশ্বরগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার জাটিয়া ইউনিয়নে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো দিঘা বিলের সংযোগ খালটি দখল ও ভরাট হয়ে নিশ্চিহ্নের পথে। এতে বর্ষা মৌসুমে আশপাশের কয়েকটি গ্রামে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে কৃষিজমি, পানের বরজ ও মৎস্য খামার ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত খালটি পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জাটিয়া ইউনিয়নের হাড়িশ্বর গ্রামের একটি মাঠ থেকে উৎপত্তি হয়ে খালটি প্রায় ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে টাংগনগাতি গ্রামের দিঘা বিলে গিয়ে মিলিত হতো। পথে এটি হারুয়া, দরগাপাড়া-তুলিয়াটি ও মালিয়াটি গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। একসময় ২৪ থেকে ২৫ ফুট প্রশস্ত এই খালে নৌকা চলাচল করত এবং কৃষিপণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো।
তবে দীর্ঘদিন ধরে খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলা, অবৈধ দখল ও মাটি ভরাটের কারণে এর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে খালের সংযোগস্থলে পুকুর খনন করে পাড় উঁচু করায় দিঘা বিলের সঙ্গে খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে বর্ষা মৌসুমে আশপাশের কয়েকটি গ্রামে জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এতে শতাধিক একর ফসলি জমি পানিবন্দী হয়ে পড়ে, পানের বরজ নষ্ট হয় এবং পুকুরের পাড় ভেঙে মাছ বেরিয়ে যায়। ফলে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং অনেক জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
টাংগনগাতি, হারুয়া, দরগাপাড়া-তুলিয়াটি ও মালিয়াটি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, খালটি দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই বর্ষায় তাদের দুর্ভোগ বাড়ছে। দ্রুত খালটি দখলমুক্ত করে পুনঃখনন না করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
তবে খালের সংযোগস্থলে পুকুর খননের অভিযোগ অস্বীকার না করে সংশ্লিষ্ট পক্ষের একজন জানান, খালটি আগেই ভরাট ছিল; সরকারি উদ্যোগে খনন কাজ শুরু হলে তারা পুকুরের পাড় সরিয়ে নিতে প্রস্তুত।
এ বিষয়ে স্থানীয়রা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে খালটি দখলমুক্ত ও পুনঃখননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।
একজন সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে মো. সোলেমান মিয়া মনে করেন, এই জলাধারগুলো কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—এগুলো আমাদের পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
প্রথমত, নদ-নদী ও খাল প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। এগুলো ভরাট বা দখল হয়ে গেলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করে, যা কৃষি, বসতবাড়ি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে—ঈশ্বরগঞ্জের এই ঘটনাই তার বাস্তব উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, কৃষি উৎপাদনের জন্য সেচব্যবস্থায় নদী ও খালের ভূমিকা অপরিসীম। এগুলো নষ্ট হয়ে গেলে কৃষকরা পানির সংকটে পড়ে, ফলে ফসল উৎপাদন কমে যায় এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
তৃতীয়ত, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নদী ও খাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাছসহ নানা জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
চতুর্থত, নদ-নদী ও খাল দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্থানীয় অর্থনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িত। এগুলো রক্ষা না করলে দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি অনিবার্য।
অতএব, নদ-নদী ও খাল সংরক্ষণ, পুনঃখনন এবং দখলমুক্ত করার বিষয়ে কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় এর বিরূপ প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হবে। ঈশ্বরগঞ্জের দিঘা বিলের এই খালটি সেই বাস্তবতারই একটি সতর্কবার্তা।

বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।

এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।