মোল্লাহাটে সেরা প্রতিষ্ঠানের সম্মাননা পেলেও লায়লা আজাদ কলেজের ফলাফলে বড় বিপর্যয়

2 November 2026, 11:27:53

মোল্লাহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি:

যশোর বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় শোচনীয় ফলাফল অর্জনকারী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ‘সেরা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে সম্মাননা স্মারক দেওয়ার ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে পাস ও জিপিএ অর্জনের দিক থেকে বোর্ডের ফলাফলে বিপর্যয়কর চিত্র, অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান’ এর পুরস্কার প্রাপ্তি, এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে নানা ধরনের পোস্ট এবং সচেতন মহলে শুরু হয়েছে নানা সমালোচনা ও প্রশ্নবিক্ষোভ।

প্রাপ্ত ফলাফলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট উপজেলার চরকুলীয়ায় অবস্থিত লায়লা আজাদ কলেজ (ইআইআইএন: ১১৪৯৮১) থেকে মোট ৬৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২ জন, মানবিক বিভাগ থেকে ৬২ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ৩ জন পরীক্ষার্থী ছিল।

তবে ফলাফলের পরিসংখ্যানে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির মোট ৬৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে ৬৪ জন শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য (ফেল) অথবা অন্যান্য কারণে ব্যর্থ হয়েছেন। বিজ্ঞান বিভাগে ২ জনের সবাই, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৩ জনের সবাই এবং মানবিক বিভাগের ৬২ জনের মধ্যে সিংহভাগ শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। সমগ্র প্রতিষ্ঠানের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জিপিএ-৫ কিংবা জিপিএ-৪ এর ঘরে কোনো শিক্ষার্থীই জায়গা পাননি। ৩.৫০ থেকে ৪.০০ এর মধ্যে মাত্র ২ জন এবং ২.৫০ থেকে ৩.০০ এর মধ্যে মাত্র ১ জন শিক্ষার্থী পাস করতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ, শতভাগ বা সন্তোষজনক পাসের হার তো দূরের কথা, প্রতিষ্ঠানের পাস করার হার মাত্র ৪.৪৭ শতাংশের কাছাকাছি।

অথচ অবাক করার বিষয় হলো, এমন নজিরবিহীন ও হতাশাজনক ফলাফলের পরেও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, মোল্লাহাট, বাগেরহাটের পক্ষ থেকে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৫/২০২৬ এর প্রাক্কালে বা কার্যক্রমে এই প্রতিষ্ঠানকেই শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান (কলেজ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়েছে।

শিক্ষানুরাগী ও স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানদণ্ড নির্ধারিত হওয়ার কথা মূলত তার পাসের হার, শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষার্থীর ফলাফল এবং সামগ্রিক অ্যাকাডেমিক পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু যেখানে সিংহভাগ শিক্ষার্থী পাস করতেই ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে কোন মানদণ্ডে বা কার স্বার্থে এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘শ্রেষ্ঠ কলেজ’-এর স্বীকৃতি দেওয়া হলো তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় সচেতন মহল।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ মফিজুর রহমান বলেন, উপজেলায় তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য বলা হয়েছিল, কিন্তু বারবার তাগিদ দেয়া সত্বেও দুটি প্রতিষ্ঠান এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেনি, ফলে এককভাবে লায়লা আজাদ কলেজকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনোনীত করা হয়।

লায়লা আজাদ কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ নুরুজ্জামান গত দেড় বছর ধরে অসুস্থ থাকায় বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যাক্ষ মহাসিন। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে “ দৈনিক ইনকিলাব “এর সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি এক খোলামেলা সাক্ষাৎকার প্রদান করেন।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মহাসিন বলেন, আমাদের কলেজের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ ও প্রতিষ্ঠানমুখী হতে অনেকটাই অনাগ্রহী। তাছাড়া অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উচ্চমানের ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা সাধারণত এলাকার বাইরে কিংবা মোল্লাহাটের কে.আর. কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ফলে প্রভাব ফেলে।

তবে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে কর্তৃপক্ষ যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের ভালো ফল নিশ্চিত করতে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি এবং এই বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।

সাময়িক এই ধাক্কা সামলে ওঠার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। আগামীতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে আমরা আরও সমৃদ্ধ ও চমৎকার ফলাফল ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।

স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিক সমাজ প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিস্থিতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মনে করছেন, শুধুমাত্র প্রশ্নপত্রের কাঠিন্য কিংবা শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে এ ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব নয়; বরং এর নেপথ্যে প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিংয়ের ঘাটতি, পাঠদান পদ্ধতির কার্যকারিতা এবং মূল্যায়নের মাপকাঠি কতটুকু মানসম্মত ছিল তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। সার্বিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সংকট এড়াতে তাঁরা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের পক্ষ থেকে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।

বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।

এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।