আইলার ক্ষত রেখে ১৭ বছর, এখনো ড্রামের ভেলায় মঠবাড়ীর মানুষ

29 September 2026, 12:13:19

ফরহাদ হোসাইন,কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি:

পূর্ব পাশে শাকবাড়িয়া নদী, ওপারে সুন্দরবন। দক্ষিণে প্রশস্ত খাল। মাঝখানে সবুজ-শ্যামল মঠবাড়ী গ্রাম। একসময় ফসলের মাঠ, মাছের ঘের, বিদ্যালয় ও কমিউনিটি ক্লিনিক ঘিরে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য। কিন্তু ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর বদলে যায় সেই চিত্র। আইলার আঘাতে শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণ পানিতে প্লাবিত হয় এলাকা। দীর্ঘদিনের জোয়ার-ভাটার পানির প্রবাহে গ্রামের মাঝখান দিয়ে সৃষ্টি হয় একটি খাল। সেই খাল এখন গ্রামটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।
আইলার পর প্রায় ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও খালের ওপর নির্মাণ হয়নি স্থায়ী বাঁধ বা সেতু। ফলে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের তৈরি ভেলায় পারাপার হতে হচ্ছে মঠবাড়ীর মানুষকে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে স্কুলগামী শিশু, নারী ও বয়স্করা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষা মৌসুমে পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে ভেলায় পারাপার আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গতকাল রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, খালটির দুই পাড়ের দূরত্ব প্রায় ১৭০ মিটার। পশ্চিম পাড়ে রয়েছে প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, প্রতাপ স্মরণী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। পূর্ব পাড় থেকে পশ্চিম পাড় পর্যন্ত একটি রশি বাঁধা রয়েছে। সেই রশি ধরে টেনে ড্রামের ভেলায় খাল পার হচ্ছেন শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা।
প্রতিদিন এভাবে পারাপারের সময় সামান্য অসতর্কতায় ভেলা উল্টে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে ভেলা উল্টে শিক্ষার্থীদের পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমা খাতুন বলেন, “প্রতিদিন ড্রামের ভেলায় চড়ে স্কুলে যেতে হয়। পার হওয়ার সময় ভয় লাগে, কখন ভেলা উল্টে যায় বলা যায় না। যেকোনোভাবে এখানে একটি বাঁধ নির্মাণ করে আমাদের নিরাপদে স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।”
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া বলেন, “ড্রামে চড়ে ওপারে স্কুলে যেতে খুব ভয় হয়। একবার ভেলা উল্টে পানিতে পড়ে গিয়েছিলাম। বইয়ের ব্যাগসহ সবকিছু ভিজে যায়। পাশে লোকজন থাকায় কোনোভাবে জীবন রক্ষা পেয়েছিল। এখানে একটি রাস্তা হলে আমরা নিরাপদে স্কুলে যেতে পারব।”
প্রতাপ স্মরণী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক হোসনেয়ার খাতুন বলেন, “বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর পর খুব চিন্তায় থাকতে হয়। একবার ভেলায় পার হতে গিয়ে আমার মেয়েসহ কয়েকজন শিশু পানিতে পড়ে গিয়েছিল। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছে। দ্রুত এখানে রাস্তা ও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা দরকার।”
প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রণজিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, “২০০৯ সালে আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এখানে একটি বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিনিয়ত বাচ্চাদের ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় পারাপার হতে হয়। যোগাযোগ সমস্যার কারণে অনেক অভিভাবক এখন তাদের সন্তানদের এই স্কুলে ভর্তি করাতে চান না।”
তিনি আরও বলেন, “এখানে স্থায়ী বাঁধ ও নিরাপদ সড়ক নির্মাণ করা হলে কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হবে। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও কমবে। দ্রুত বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।”
মহারাজপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু সাঈদ বলেন, “১৭০ মিটারের বেশি এই ভাঙনে ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য বরাদ্দ দিয়ে কাজ করা সম্ভব নয়। এখানে পানির গভীরতাও অনেক বেশি। প্রতিনিয়ত এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের এভাবেই পারাপার হতে হয়। একটি ভাসমান সেতু কিংবা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা গেলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে।”
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, খুলনার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহমুদ বলেন, “প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন বাঁধটি পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বরাদ্দের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।”

বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।

এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।