ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
মোংলা বন্দরের বিভিন্ন প্রতিকূলতা কাটিয়ে পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা অর্জনে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে মোংলা বন্দরের অবকাঠামোগত ওoperational সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সভাকক্ষ আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় এই কৌশলগত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা।
মূলত দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের একক বন্দরের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি হ্রাস এবং বন্দরের বিদ্যমান অপারেশনাল ঘাটতি দূর করার লক্ষ্যেই এই নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সামনে তিনি বন্দর ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, চলমান মেগা প্রকল্প এবং ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন, যা জাতীয় অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সভায় বন্দরের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত থেকে বন্দরের সার্বিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই উদ্যোগ দেশের লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় এক নতুন গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে মোংলা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা বা পটেনশিয়ালকে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি বলে মত প্রকাশ করেছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে পর্যাপ্ত ডিপ ওয়াটার ফ্যাসিলিটির অভাব, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার ফলে ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিলেন। এই সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত মূলায়ন করে কর্তৃপক্ষ এখন সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যার মধ্যে একটি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ কাজ এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
এছাড়া বন্দরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যার অংশ হিসেবে প্রায় ১০০ একর জমিতে শিল্প-কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই শিল্পাঞ্চলগুলো চালু হলে সরাসরি বন্দরের জেটি এবং কারখানার মধ্যে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব ও সময় কমবে, যা সামগ্রিক ব্যবসায়িক খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনবে। ব্যবসায়িক মহলের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল মোংলা বন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার, আর বর্তমান পরিকল্পনাটি সেই দাবিরই একটি কাঠামোগত রূপায়ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট অংশীজন, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং গণমাধ্যমকর্মীরা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। মতবিনিময় সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন যে, ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেবল সঠিক লজিস্টিকস সাপোর্ট এবং পৃষ্ঠদেশের সংযোগের অভাবে মোংলা বন্দর তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। তবে বর্তমান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গৃহীত বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এবং যথাযথ স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়িত হয়, তবে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি মাল্টি-পোর্ট বা বহুমুখী বন্দর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার যে তাগিদ দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হচ্ছিল, বর্তমান উদ্যোগটি সেই সংকটের একটি বাস্তবসম্মত সমাধান। বন্দর কর্তৃপক্ষ আশাবাদী যে, চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর কাছে মোংলা বন্দরের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগ সক্ষমতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তা কেবল জাতীয় বাণিজ্যে নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও এক বিরাট রূপান্তর ঘটাবে। নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপিত হলে উপকূলীয় অঞ্চলে বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। একই সাথে মাতারবাড়ী এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন দেশের পুরো মেরিটাইম সেক্টরকে একটি বিশ্বমানের কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে সাহায্য করবে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন তদারকি, দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো প্রকল্প সম্পন্ন করার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা।
ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্যের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে মোংলা বন্দর যদি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিধারাকে আরও বেগবান করবে এবং দেশের সার্বিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে একটি স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
প্রকাশকও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ.বার্তা সম্পাদক:মোঃ জাকির হোসেন,IT ইনচার্জ: আসমা-উল-হুসনা।