মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, ২০২৬

নড়াইলের মুলিয়ায় এক পা-তেই জীবন সংসার গোপী বিশ্বাস’র প্রতিবন্ধী জীবনটাই যেন অভিশাপ

5 August, 2026 10:24:57
নড়াইলের মুলিয়ায় এক পা-তেই জীবন সংসার গোপী বিশ্বাস'র প্রতিবন্ধী জীবনটাই যেন অভিশাপ

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি:

নড়াইলের মুলিয়ায় এক পা-তেই জীবন সংসার গোপী বিশ্বাসে’র। প্রতিবন্ধী জীবনটাই যেন অভিশাপ। জন্ম থেকেই একটি পা অচল গোপী বিশ্বাসের (৩২)। হাঁটাচলা করতে হয় লাঠি ভর দিয়ে। ছোটোবেলা থেকে চেষ্টা করেছেন আত্মনির্ভরশীল হওয়ার। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন ইলেকট্রনিক পণ্য মেরামতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি জানান, নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের কাজলা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত পানতিতা গ্রামের বাসিন্দা গোপী। বাবা নিতাই বিশ্বাস ও মা কল্পনা বিশ্বাসের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। গরিব পরিবারে জন্ম নেওয়ায় পড়াশোনার সুযোগ পাননি তিনি। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর পারিবারিক অবস্থার কারণে স্কুল ছাড়তে হয় তাকে।
ছোটোবেলায় এলাকার এক দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ শেখা শুরু করেন গোপী। টর্চ লাইট, গ্যাস লাইটসহ নানা বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র মেরামতের কাজ রপ্ত করেন তিনি। প্রায় ১৯ বছর ধরে এই পেশায় রয়েছেন। কিন্তু একটানা এই পেশায় টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। আয় কম হওয়ায় মাঝে মাঝে ভ্যান চালানো, চা বিক্রি, এমনকি ওয়েল্ডিংয়ের কাজও করতে হয়েছে তাকে। তবে প্রতিবন্ধকতা থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
শেষমেশ আবারও মেরামতের পেশায় ফিরেছেন তিনি। জেলা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে মুলিয়া বাজারের দক্ষিণ পাশে, মুলিয়া-বাহিরগ্রাম সড়কের এক পাশে ছোট একটি একচালা দোকান বসিয়েছেন। টিনের ছাউনি থাকলেও চারপাশে কোনো বেড়া নেই। সেখানেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসে টর্চ লাইট, গ্যাস লাইট, এলইডি বাল্ব, স্প্রে মেশিন ও রাইস কুকারসহ নানা ইলেকট্রনিক সামগ্রী মেরামত করেন।
চার সদস্যের পরিবার গোপীর ঘাড়ে। স্ত্রী, এক শিশুপুত্র এবং এক কন্যাসন্তান নিয়ে তার সংসার। বড় মেয়েটি বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিন কাজ করে আয় হয় মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। ভালো দিন হলে ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। কিন্তু বর্তমান বাজার দরে এই টাকায় সংসার চালানো সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে ব্যাগে যন্ত্রপাতি ভরে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে পাশের তুলারামপুর হাটেও যান কাজের খোঁজে।
গোপী বিশ্বাস বলেন, ‘আজ একটু হলুদ কিনি, কাল একটু লবণ। ছেলেমেয়েকে মাছ খাওয়াতে পারি না। দেনা করে বাজার করতে হয়। তিন মাস পর প্রতিবন্ধী ভাতার কিছু টাকা পাই, তাও দেনা শোধে চলে যায়।’
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবন্ধী জীবনটাই যেন অভিশাপ। সংসার চালাব, না ছেলেমেয়েকে মানুষ করব—এই দুশ্চিন্তায় থাকি। সরকারের কাছে অনুরোধ, যেন আমাদের মতো মানুষদের পাশে দাঁড়ায়, আমাদের সন্তানরা মানুষ হতে পারে, সেই ব্যবস্থা করে। ওরা মানুষ হলে আমাদের কষ্টের কিছুটা হলেও সার্থকতা থাকবে।’
গোপীর কাজের প্রশংসা করেন স্থানীয়রাও। তারা জানান, তার মতো অভিজ্ঞ মেরামতকারীর কাজের ওপর অনেকেই নির্ভরশীল। তিনি না থাকলে এসব কাজের জন্য শহরে যেতে হতো, সময় ও অর্থ ব্যয় হতো বেশি।
গোপীর দোকানে লাইট মেরামত করতে আসা মিলন সরকার বলেন, ‘গোপীর কাজের মান ভালো হাওয়ায় তার নিকট আমরা ইলেকট্রনিক বিভিন্ন জিনিস মেরামত করতে আসি। তার কষ্ট দেখে খারাপ লাগে, কিন্তু আমরা নিজেরাও খুব বেশি কিছু করতে পারি না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই খুপড়ি ঘরে বসে ইলেকট্রনিক যন্ত্র মেরামত করে সংসার চালায় সে।’
কোড়গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ রায় বলেন, ‘গোপী দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারে কাজ করছে। ভালো মানুষ, ভালো কাজ করে। আমরা তার ওপর ভরসা করি। যদি সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কেউ এই সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো গোপীর মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন আরেকটু সহজ হয়ে উঠবে।’
মুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, ‘গোপী বিশ্বাস এক জন প্রতিবন্ধী হয়েও স্বাভাবিক মানুষের মতো সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তার এই সংগ্রামী জীবন অন্যদের জন্য অনুকরণীয়। তার মতো অনেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু তিনি কারো কাছে হাত পাতেন না। ছোট থেকেই কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। ইতিমধ্য সে প্রতিবন্ধী ভাতার সুবিধাভোগী। তাকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যতটুকু পারা যায় সহযোগিতা করা হবে।
উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি। ছবি আছে।

সর্বশেষ

  • প্রকাশক ও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ বার্তা সম্পদাক : মোঃ জাকির হোসেন
  • আইটি ইনর্জাচ : আসমা-উল-হুসনা মোবাইল : 01737208208
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় , ৩৭/৬, আজিমপুর রোড, আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫ ইমেইল : buletin247@gmail.com, 01711977369

Developed by bditsupport

PhotoCard Icon
Create PhotoCard