রবিবার ১০ মে, ২০২৬

ক্ষতিগ্রস্ত ধানচাষিদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিন: ঢাকায় মানববন্ধন ও সমাবেশে মাহমুদুল হাসান মানিক

10 May, 2026 8:27:36
ক্ষতিগ্রস্ত ধানচাষিদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিন: ঢাকায় মানববন্ধন ও সমাবেশে মাহমুদুল হাসান মানিক

দেওয়ান মাসুকুর রহমান, নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকাঃ

জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক বলেছেন, দেশব্যাপী জরুরী ভিত্তিতে হাওরের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।

এর প্রাসঙ্গিকতা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় সাম্প্রতিক অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবার বোরো ধানের ওপর বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে নষ্ট হয়েছে। এতে লাখো কৃষক পরিবার তাদের বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে হাওরের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান,খোদ কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয়, ধান সংরক্ষণের জন্য প্যাডি সাইলো নির্মাণ, কৃষিপণ্যের বাজারজাত করণ সহজলভ্য করা, সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচ সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং জরুরি খাদ্য সহায়তা ও কৃষি পুনর্বাসনের দাবিতে ঢাকায় আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শনিবার (৯ মে ২০২৬) বিকেল ৪টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে জাতীয় কৃষক সমিতি। একইসঙ্গে এই সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তির নামে কৃষি ও কৃষক ধ্বংসের ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার আহ্বান জানান।

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কৃষক নেতা মাহমুদুল হাসান মানিক। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক দীপংকর সাহা দীপু।

সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন রাজু, জাতীয় কৃষক সমিতির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মোস্তফা আলমগীর রতনসহ অন্যান্য নেতারা। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা হবিবর রহমান, তানভীর রুসমত, সাইদুর রহমান, রাজিয়া সুলতানা, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেতা সাব্বাহ আলী খান কলিন্স, জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুর্শিদা আখতার নাহার, বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শিউলি শিকদার, সহ-সাধারণ সম্পাদক সাহানা ফেরদৌসি লাকী, বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তাপস দাস এবং বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি অতুলন দাস আলো।

মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে একটা র‍্যালি তোপাখানা রোড ঘুরে জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে শেষ হয়।

সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্মসূচিতে হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য অবিলম্বে নগদ আর্থিক সহায়তা, সংগৃহীত পাকা ধান সংরক্ষণের ব্যবস্থা, ছয় মাসের খাদ্য সহায়তা এবং বিনামূল্যে গবাদিপশুর খাদ্য সরবরাহের দাবি জানানো হয়।

সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুল হাসান মানিক বলেন, সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় হাওড় অঞ্চলের কৃষকরা ব্যাপক ফসলহানির শিকার হলেও সরকার এখনো পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে পারেনি। এতে কৃষক পরিবারগুলো চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে। তিনি অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়ার দাবি জানান।

তিনি আরও বলেন, মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই কৃষকের উৎপাদিত ধানের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে এবং সরকারি উদ্যোগে সরাসরি ক্ষুদ্র কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও বলেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে বিদ্যমান অসম বাণিজ্য চুক্তি দেশের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর এবং এটি দেশীয় উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলবে। তাই এ ধরনের চুক্তি বাতিলের দাবি জানান তারা।

জাতীয় কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মানিক আরও বলেন, “হাওরাঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানকার বোরো ধান জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ অঞ্চলের কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এবারও বহু কৃষক তাদের স্বপ্নের ফসল ঘরে তুলতে পারেননি।”

নেতৃবৃন্দ বলেন, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অনেক এলাকায় ধান কাটার আগেই বন্যার পানিতে ফসল তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক এনজিও, ব্যাংক ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। কিন্তু ফসলহানির কারণে এখন তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষক নেতারা অভিযোগ করেন, প্রতিবছর দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেকেই পর্যাপ্ত সহায়তা পান না। ফলে কৃষক পরিবারগুলো ঋণ, খাদ্যসংকট এবং জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসনের দাবি

জাতীয় কৃষক সমিতির নেতৃবৃন্দ সরকারের কাছে কয়েকটি জরুরি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান,
জরুরি ভিত্তিতে নগদ আর্থিক সহায়তা,
আগামী মৌসুমে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ,
কৃষিঋণ মওকুফ বা সহজ শর্তে পুনঃতফসিল,
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ছয় মাসের খাদ্য সহায়তা,
গবাদিপশুর জন্য বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ।

সংগঠনটির নেতারা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসন না করা হলে আগামী মৌসুমে আবাদ ব্যাহত হতে পারে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব

কৃষক নেতারা হাওরাঞ্চলের সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, প্রতিবছর অকাল বন্যা ও বাঁধ ভাঙনের কারণে বিপুল পরিমাণ ফসলহানি হচ্ছে। তাই টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, নদী খনন এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।

জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, “দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য সরকারের দ্রুত, কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।”

এদিকে এ আন্দোলনের কর্মসূচি সফল করায় সকলকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এবং আরপি নিউজের সম্পাদক কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “প্রতিবছরই হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে, যা কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাঁচাতে সরকার কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওরাঞ্চল দেশের বোরো ধানের অন্যতম প্রধান উৎপাদন এলাকা। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধান জাতীয় খাদ্য ভাণ্ডারে বড় অবদান রাখে। ফলে বড় আকারে ফসলহানি হলে তার প্রভাব শুধু কৃষকের জীবিকাতেই নয়, সামগ্রিক খাদ্য বাজার ও অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

আরও জানা গেছে, অনেক কৃষক শেষ মুহূর্তে ধান কাটতে গিয়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ব্যর্থ হয়েছেন। কোথাও কোথাও কৃষকরা আধাপাকা ধান কেটে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও অতিবৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধির কারণে তা সম্ভব হয়নি।

জাতীয় কৃষক সমিতির নেতৃবৃন্দের মতে, দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব, পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগও দীর্ঘদিনের সমস্যা। এজন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন ও সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।

মানববন্ধন থেকে নেতারা কৃষকদের স্বার্থে দ্রুত দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। অন্যথায় জাতীয় কৃষক সমিতি সারাদেশে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা।

সর্বশেষ

  • প্রকাশক ও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ বার্তা সম্পদাক : মোঃ জাকির হোসেন
  • আইটি ইনর্জাচ : আসমা-উল-হুসনা মোবাইল : 01737208208
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় , ৩৭/৬, আজিমপুর রোড, আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫ ইমেইল : buletin247@gmail.com, 01711977369

Developed by bditsupport