ইতিহাসের অন্দরমহলে আলো-ছায়ার খেলা, মহিবুর রহমানের ‘মুর্শিদাবাদের আলোছায়া’ | বিডি-প্রেস 24 ডট কম
হোম / স্বাস্থ্য / বিস্তারিত

ইতিহাসের অন্দরমহলে আলো-ছায়ার খেলা, মহিবুর রহমানের ‘মুর্শিদাবাদের আলোছায়া’

2 October 2026, 1:35:33

ইতিহাসের অন্দরমহলে আলো-ছায়ার খেলা, মহিবুর রহমানের ‘মুর্শিদাবাদের আলোছায়া’

লেখক: মহিবুর রহমান- 

মূল বিষয়: ইতিহাস, ঐতিহ্য, আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও গবেষণা।
ইতিহাস কোনো স্থবির দলিল নয়, বরং তা এক জীবন্ত মহাকাব্য। বিশেষ করে সেই ইতিহাস যদি হয় মুর্শিদাবাদের, তবে তার প্রতিটি ধূলিকণায় লুকিয়ে থাকে নবাবি আমলের জৌলুস, ষড়যন্ত্রের দীর্ঘশ্বাস, পলাশীর প্রান্তরের বেদনামথিত অধ্যায় আর এক ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতির গল্প। সময়ের নিয়মে সেই জৌলুস হয়তো আজ ম্লান, কিন্তু ধুলোবালি জমা ইতিহাসের পাতা থেকে সত্য, রোমাঞ্চ ও মানবিক দলিলকে নতুন করে আলোয় তুলে এনেছেন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক মহিবুর রহমান। সম্প্রতি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী লীলা রায় সভাঘরে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে বইটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায় । উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ পদ্মশ্রী কাজি মাসুম আখতার, কবি ও সাহিত্যিক সৈয়দ হাসমত জালাল ও ডাঃ জহর মজুমদারসহ অনেকে। কবি ও সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হয়েছে তাঁর নতুন তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘মুর্শিদাবাদের আলোছায়া’। বইটির ভূমিকা লিখেছেন কথা সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় তপন বন্দ্যোপাধ্যায়।সাহিত্য-সংস্কৃতির বোদ্ধাদের উপস্থিতিতে প্রকাশিত এই বইটি ইতিমধ্যেই সুধীমহল ও সাধারণ পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
মুর্শিদাবাদের ক্যানভাসে আলো আর আঁধারের সন্ধানে
‘মুর্শিদাবাদের আলোছায়া’ কেবল কোনো শুষ্ক ঐতিহাসিক সাল-তারিখের নিস্প্রাণ সংকলন নয়। লেখক মহিবুর রহমান এখানে মুর্শিদাবাদের উত্থান-পতনকে দেখেছেন এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বইটির নামকরণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর মূল উপজীব্য। নবাবি আমলের যে ‘আলো’ বা গৌরব—যেমন স্থাপত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, রেশম শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার—তার পাশাপাশি সমান্তরালভাবে হেঁটেছে ‘ছায়া’ বা অন্ধকারের গল্প। এই ছায়া হলো ক্ষমতার লোভ, মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা, ঘসেটি বেগমের অন্তর্দহন এবং লর্ড ক্লাইভের কূটকৌশল।
লেখক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে ভাগীরথীর তীরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল এবং তার পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে কী ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছিল। পলাশীর যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলার রাজনৈতিক আলো-আঁধারি এবং এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি যেভাবে বইটিতে স্থান পেয়েছে, তা এককথায় অনবদ্য।
আকর গ্রন্থ ও গভীর গবেষণা
ইতিহাসের জটিল সমীকরণগুলোকে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় ভাষায় উপস্থাপন করা সহজ সাধ্য নয়। কিন্তু মহিবুর রহমান এই কঠিন কাজটি করেছেন অত্যন্ত মুনশিয়ানার সাথে। বইটির প্রতিটি অধ্যায়ে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য লেখক যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তা বইটির বিবরণ এবং রেফারেন্স দেখলেই স্পষ্ট হয়। তিনি কেবল প্রচলিত ইতিহাসের ওপর নির্ভর করেননি, বরং মুর্শিদাবাদের আনাচে-কানাচে ঘুরে লোকশ্রুতি, আঞ্চলিক উপাদান এবং প্রাচীন নথিপত্র ঘেঁটে সত্যকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছেন। নতুন প্রজন্মের পাঠক, যাঁরা মুর্শিদাবাদ বলতে কেবল হাজারদুয়ারি বা কাটরা মসজিদ বোঝেন, তাঁদের কাছে এই জেলাটির ঐতিহাসিক গভীরতা তুলে ধরতে বইটি একটি আকর গ্রন্থ বা রেফারেন্স বই হিসেবে কাজ করবে।
ঐতিহ্যের নিষ্ঠাবান অন্বেষক
মহিবুর রহমান সমকালীন বাংলা সাহিত্য ও গবেষণা জগতের একটি অত্যন্ত পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি একাধারে কবি, সমাজমনস্ক সাহিত্যিক এবং প্রাবন্ধিক-গবেষক। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাস, প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রা, লোকসংস্কৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর পূর্ববর্তী লেখনিতেও আমরা তথ্যের সত্যতা এবং সাহিত্যের নান্দনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখেছি।
মহিবুর রহমানের জন্ম মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে। তবে বেড়ে ওঠা ও লেখাপড়া মহানগরীতে। পিতা – ডাঃ জয়নাল আবেদিন,মাতা- উমেরা বেগম। তাঁর একমাত্র কন্যা সন্তান ফারহিন খাতুনও লেখালেখি শুরু করেছে, আবৃত্তিকারও। মহিবুর পেশায় চাকরিজীবী। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। এছাড়া হোমিওপ্যাথি এবং সাংবাদিকতা নিয়েও তিনি পড়াশোনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্ৰন্থের মধ্যে রয়েছে, জীবনের সঙ্গে দেখা ( কবিতা ও গল্প, ২০১৭), জীবনের ছায়াছবি (কবিতা ও গল্প, ২০১৮), জীবনের কলরব ( গদ্য, ২০১৯), রাজনীতির রঙ -বেরঙ( প্রবন্ধ,২০২০), জীবনের গল্পকথা ( গদ্য,২০২১) , অচেনা অজানা মুর্শিদাবাদ ( গবেষণাধর্মী গ্ৰন্থ,২০২২),’রাত বারোটার কলকাতা ( তথ্যভিত্তিক গ্ৰন্থ, ২০২৩), জানা অজানা বহরমপুর পৌরসভা ( তথ্যভিত্তিক গ্ৰন্থ, ২০২৪), শুধুই তুমি ( কাহিনি ও চিত্রনাট্য, ২০২৫), সান্ধ্যছায়া ( সম্পাদিত সাহিত্য সংকলন,২০২৫) । এছাড়াও ভালোবাসার দুই দিগন্ত সংকলন এবং ভালোবাসার নবদিগন্ত সংকলনের সহ সম্পাদক ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি’এবং অনপেক্ষ’ সাহিত্য সংকলনের সম্পাদক। ভারত ও বাংলাদেশের পত্র- পত্রিকায় তাঁর বহু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বেশ কিছু পুরুস্কারও তিনি পেয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ‘‘মুর্শিদাবাদের আলোছায়া’ গ্রন্থটি তাঁর সেই দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, সংবেদনশীলতা ও নিবিড় গবেষণারই এক পরিণত ফসল। একজন কবি যখন ইতিহাসের চর্চা করেন, তখন শুষ্ক তথ্যও যে কতটা প্রাঞ্জল ও কাব্যিক হয়ে উঠতে পারে, মহিবুর রহমানের গদ্যশৈলী তার অন্যতম প্রমাণ।
অনন্য বর্ণনাশৈলী ও প্রাসঙ্গিকতা
বইটির সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো এর ভাষা এবং সাবলীল বর্ণনাশৈলী। ইতিহাসকে রোমাঞ্চকর উপন্যাসের মতো গতিশীল রাখা এবং পাঠককে শেষ পাতা পর্যন্ত ধরে রাখা লেখকের গদ্যের অন্যতম ম্যাজিক। প্রতিটি চরিত্র—সে সিরাজউদ্দৌলা হোক বা সাধারণ কোনো কারিগর—লেখকের কলমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
বর্তমান সময়ে যখন বিকৃত ইতিহাস বা অতিরঞ্জিত কাহিনীর ভিড়ে আসল সত্য ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, তখন এই ধরনের নিরাসক্ত ও তথ্যনিষ্ঠ ঐতিহাসিক গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। বইটি শুধু মুর্শিদাবাদের ইতিহাসকেই তুলে ধরে না, বরং তা সমগ্র বাংলার তৎকালীন সমাজচিত্রের এক নিখুঁত আয়না।
ইতিহাসের আলো যেখানে ম্লান আর ছায়ারাই যেখানে রহস্যের জন্ম দেয়, সেই গোলকধাঁধায় পাঠককে হাত ধরে ঘুরিয়ে আনবে ‘মুর্শিদাবাদের আলোছায়া’। যাঁরা বাংলার ইতিহাসকে ভালোবাসেন, নবাবি আমলের অন্তরালের সত্য গল্প জানতে চান এবং ইতিহাসের আলো-ছায়ার খেলায় মেতে উঠতে চান, তাঁদের বুকশেলফে বইটি একটি অত্যন্ত মূল্যবান ও দীর্ঘস্থায়ী সংযোজন হতে পারে। খবরের কাগজের সাহিত্য পাতার পাঠক থেকে শুরু করে ইতিহাসের গবেষক—সবার জন্যই বইটি সংগ্রহে রাখার মতো।
আমরা বইটির বহুল প্রচার এবং লেখক মহিবুর রহমানের উত্তরোত্তর সাহিত্যিক সাফল্য কামনা করি।

মুর্শিদাবাদের আলোছায়া
লেখক – মহিবুর রহমান
প্রকাশক – চারুপত্র প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ -‘আগষ্ট ,২০২৬
মূল্য – ৩০০ টাকা

বিডি-প্রেস 24 ডটকম কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, তথ্য ইত্যাদির অননুমোদিত ব্যবহার কপিরাইট আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য।

এই আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃক যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য:

PhotoCard Icon
Create PhotoCard