শুক্রবার ১ মে, ২০২৬

মে দিবসের চেতনায় গাইবান্ধা: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতায় উত্তরণের দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন

1 May, 2026 12:41:28
মে দিবসের চেতনায় গাইবান্ধা: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতায় উত্তরণের দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন

মোঃ রিয়ায এলাহী রাজন, গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধিঃ

গাইবান্ধায় যথাযোগ্য মর্যাদা, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মহান মে দিবস ও জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে।

শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, শ্রমিক সমাবেশ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরা হলেও এর গভীর বার্তা আমাদের সামনে এক অনিবার্য প্রশ্ন তুলে ধরে—শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কতটা আন্তরিক?

“সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত—এবার আসবে নতুন প্রভাত”—এই প্রতিপাদ্য নিছক আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়; এটি একটি সামাজিক অঙ্গীকার, একটি মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।

কারণ শ্রমিকই উন্নয়নের চালিকাশক্তি, তাদের শ্রমেই গড়ে ওঠে অবকাঠামো, সচল থাকে অর্থনীতি এবং এগিয়ে চলে দেশ। অথচ সেই শ্রমিকই বহু ক্ষেত্রে থেকে যায় অবহেলিত, বঞ্চিত এবং অনিরাপদ।

এ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক ডা. ময়নুল ইসলাম সাদিক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) যাদব সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিদ্রোহ কুমার কুন্ডু, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহামুদুন নবী টিটুল এবং শ্রমিক দলের সভাপতি কাজী আমিরুল ইসলাম ফকুসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

বক্তারা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা, যেখানে শ্রমিক হবে সম্মানিত, সুরক্ষিত এবং অধিকারভোগী।

মে দিবসের ইতিহাস আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১৮৮৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ে, যেখানে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে শ্রমিকরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

হে-মার্কেটের সেই আত্মত্যাগ শুধু একটি দেশের ইতিহাস নয়, বরং বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর। সেই সংগ্রামের ফলেই আজকের শ্রম আইন, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা এবং শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই অর্জনের অনেকটাই এখনো বাস্তবায়নের ঘাটতিতে ভুগছে।

গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো অসংখ্য শ্রমিক দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অপ্রতুল মজুরি, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা কর্মহীনতার সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যকর ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।

এ বাস্তবতায় মে দিবসের চেতনা কেবল স্মরণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে।

প্রয়োজন কঠোরভাবে শ্রম আইন বাস্তবায়ন, কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন, এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তৃতি। পাশাপাশি মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।

একই সঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখাও সময়ের দাবি। কারণ ইতিহাস সাক্ষী—সংগঠিত শক্তিই পারে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।

মে দিবস আমাদের শুধু অতীতের আত্মত্যাগ স্মরণ করায় না, এটি আমাদের বর্তমানকে মূল্যায়ন করতে শেখায় এবং ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা দেয়। গাইবান্ধার এ আয়োজন সেই চেতনাকে নতুন করে জাগ্রত করেছে।

এখন প্রয়োজন সেই জাগরণকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া—নীতিনির্ধারণে, কর্মপরিকল্পনায় এবং বাস্তব প্রয়োগে।

কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু অবকাঠামো নয়, বরং মানুষের জীবনমান।

আর সেই মান উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে শ্রমিককে। শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত হলেই কেবল একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

“নতুন প্রভাত”-এর স্বপ্ন তাই কেবল একটি দিনের প্রতিশ্রুতি নয়—এটি একটি চলমান সংগ্রাম, একটি অবিরাম প্রত্যাশা।

সেই প্রত্যাশা পূরণে আজ প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণ। তাহলেই মে দিবসের চেতনা সত্যিকার অর্থে বাস্তবতায় প্রতিফলিত হবে।

সর্বশেষ

  • প্রকাশক ও সম্পাদক : প্রিন্স মন্ডল অলিফ বার্তা সম্পদাক : মোঃ জাকির হোসেন
  • আইটি ইনর্জাচ : আসমা-উল-হুসনা মোবাইল : 01737208208
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় , ৩৭/৬, আজিমপুর রোড, আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫ ইমেইল : buletin247@gmail.com, 01711977369

Developed by bditsupport